অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ) ছিলেন তাসাওফ চর্চা ও আধ্যাত্ম সাধনায় এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক, গবেষক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, ইসলামি স্কলার ও মুফাসিসরে কোরআন হিসেবে ইসলামের ব্যাপক সেবা করে গেছেন। দৈনিক ইত্তেফাকে পবিত্র মাহে রমজানের সময় প্রথম পৃষ্ঠায় রমজান মাস সম্পর্কিত কলামটি তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে নিয়মিত লিখতেন। তিনি ইত্তেফাকের ধর্মচিন্তা পাতারও ছিলেন নিয়মিত লেখক। গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তার মৃত্যুর মাধ্যমে বাংলাদেশ একজন শীর্ষস্থানীয় ইসলামি পণ্ডিত ও লেখককে হারাল। অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ) ১৯৪৪ সালের ৩০ এপ্রিল মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার দারিয়াপুর ঐতিহাসিক পীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা শাহ্ সুফি তোয়াজউদ্দিন আহমদ (রহ) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত একজন পীর। হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ)-এর শিক্ষাজীবন শুরু হয় মা জোহরা খাতুনের কাছে। তিনি মায়ের কাছে শৈশবেই কোরআন শিক্ষা করেন এবং পিতার কাছ থেকে ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় দারিয়াপুর প্রাইমারি স্কুলে। পরবর্তীকালে খুলনা বি কে ইনস্টিটিউট ও মাগুরা হাই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা সরকারি ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের মাদ্রাসা শাখা থেকে মাদ্রাসা শিক্ষায় চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর জেনারেল শিক্ষা লাভের জন্য তিনি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস, সমাজ কল্যাণ, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, বাংলা ও ইংরেজি বিষয় নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে ভর্তি হন। পরে ১৯৭০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঐ বিষয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ)-এর পেশাগত জীবন শুরু হয় কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে। তিনি ঢাকার হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৮০ সালে জানুয়ারি মাসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করে খুব অল্প দিনেই মহাপরিচালক পদে উন্নীত হন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কর্মরত সময়ে তার মাধ্যমে ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ যেমন—তাফসিরে তাবারি, বুখারি শরিফ প্রভৃতি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ইসলামি বিশ্বকোষে তার অনেকগুলো মৌলিক ও অনূদিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘অগ্রপথিক’, শিশু পত্রিকা ‘সপ্তডিংগা’ ও সাহিত্য সাময়িকী ‘ঐতিহ্য’-এর সম্পাদক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া তার সম্পাদনায় ১৯৭২ সালে ‘নবকাল’ নামে মাগুরা থেকে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—‘অনুপম আদর্শ’, ‘মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী’ ও ‘খোকা-খুকুর ছড়া’। এছাড়া বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা তিন সহস্রাধিক।
অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ) তিনি তার পিতার স্মরণে আঞ্জুমানে তোয়াজিয়া নামে একটি জনকল্যাণ মূলক সংস্থা গড়ে তুলেছেন। দারিয়াপুর দরবার শরিফে তিনি গড়ে তুলেছেন আঞ্জুমানে তোয়াজিয়া নামে একটি এতিমখানা ও মাদ্রাসা। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফুরফুরা সিলসিলার যশোর দারিয়াপুর খানকার গদিনশিন পীর ছিলেন। গত ৬ অক্টোবর অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান। তাকে মাগুরার শ্রীপুরের দারিয়াপুর দরবার শরিফের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আল্লাহ তাকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। আমিন!
lলেখক :বাংলাদেশ বেতারের উপস্থাপক ও ধর্মীয় আলোচক
