বগুড়ার শেরপুরে গ্রাম্য সালিশের নামে এক নারীকে ধর্ষণ ও এক কিশোরীকে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গ্রাম্য মাতব্বরদের বিরুদ্ধে। এখানেই শেষ নয়, অভিযোগ- মাতব্বররা নির্যাতনের শিকার ওই নারী ও কিশোরীর সম্ভ্রমের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার কিশোরীর সম্ভ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৯০ হাজার টাকা এবং ধর্ষণের শিকার দিনমজুরের স্ত্রীর সম্ভ্রমের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৮০ হাজার টাকা। উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের বড়ো শিবপুর ও খামারকান্দি ইউনিয়নের ঝাজর গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে মাতব্বররা এমন রায় ঘোষণা ও কার্যকর করেছেন। তবে সম্পূর্ণ টাকাও হাতে পায়নি ভুক্তিভোগীরা। সেখানেও করা হয়েছে নয়ছয়।
ভুক্তভোগীর পরিবার, স্থানীয় এলাকাবাসী ও গ্রাম্য মাতব্বরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর দিনগত রাতে বড়ো শিবপুর গ্রামের স্থানীয় মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে মো. ছাব্বির। ছাব্বির রামনগর গ্রামের আব্দুর সালামের ছেলে। এসময় ওই ছাত্রীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন এসে হাতেনাতে লম্পট ছাব্বিরকে আটক করেন। পরে একজন প্রভাবশালীর বাড়িতে নিয়ে তাকে সেখানেই আটকে রাখা হয়।
পরদিন ওই বাড়িতে নিয়ে সালিশি বৈঠক বসেন গ্রাম্য মাতব্বররা। সেখানে মোটা অঙ্কের জরিমানা নিয়ে সালিশের মাধ্যমে ঘটনাটি আপোষ-রফা করে আটকে রাখা ছাব্বিরকে ছেড়ে নিয়ে যায় তার পরিবার। পরে মাদ্রাসা ছাত্রীর পরিবারকে আইনের আশ্রয় নিতে বাধা ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে গ্রাম্য মাতব্বর আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে।
কিন্তু আব্দুস সালাম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
এদিকে ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ওই মাদ্রাসা ছাত্রীর বাবা আব্দুল মজিদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ওই সালিসি বৈঠকে উপস্থিত থাকা গ্রাম্য মাতব্বর আব্দুল মোমিন বলেন, চেয়ারম্যানসহ অন্য গ্রাম্য মাতব্বররা বিচার করেছেন। সেই অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির নিকট থেকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে ভুক্তভোগী মেয়ের বাবাকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাকি ৩০ হাজার টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু তিনি এসবের মধ্যে নেই।
তবে ইউপি চেয়ারম্যান দবিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে মোবাইল ফোনে বলেন, ঘটনাটি আমার গ্রামের হলেও আমি কোন বিচার-সালিস করিনি। এমনকি সেখানে উপস্থিতও ছিলাম না। অবশ্য পরে আর কোনো প্রশ্ন তাকে করা যায়নি। ততক্ষণে ফোনের সংযোগ কেটে দেন চেয়ারম্যান দবিবুর।
এ বিষয়ে শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত ) আবুল কালাম আজাদ জানান, এই ঘটনার অভিযোগ পেয়েছি। দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অপরদিকে গত ১ অক্টোবর দিনগত রাতে উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের ঝাজর গ্রামের এক দিনমজুর বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেন প্রতিবেশী মো. হেলাল উদ্দীন। পরদিন ঘটনাটি নিয়ে গ্রাম্য মাতব্বর সোলায়মান আলীর বাড়িতে সালিশি বৈঠক বসানো হয়। সেখানে গ্রাম্য মাতব্বর সেলিম রেজা, ফারুক হোসেন, আজিজ ও টুনু অভিযুক্ত ধর্ষককে বেশ কয়েকটি জুতা-পেটা করে সালিশের সমাপ্তি টানেন। কিন্তু এই বিচার মানতে অস্বীকার করেন ওই গৃহবধূর স্বামী। পরে গ্রাম্য মাতব্বররা আবারও ঘরোয়াভাবে বসেন এবং ধর্ষকের কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নিয়ে ওই নারীর পরিবারকে দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছেন, এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর।
জানতে চাইলে শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এসএম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঝাজর গ্রামের ঘটনাটি সম্পর্কে জানা নেই। ভুক্তভোগী অভিযোগ দিলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইত্তেফাক/এসি
