বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ও ভায়া টেস্টের উপর গুরুত্বারোপ

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৬

জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে ৩ বছর পর পর ভায়া টেস্ট করানো জরুরি। এই ভায়া টেস্ট দেশের সরকারি সবগুলো মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে করানো হয়। তবে যারা বাল্যবিয়ে এবং অল্পবয়সে সন্তান জন্মদান করেন তারা জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকেন। ফলে এই ক্যান্সার প্রতিরোধে বাল্য বিবাহ রোধ এবং ভায়া টেস্ট করানোর উপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা।

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘জরায়ুমুখের ক্যান্সার পরিস্থিতি ও উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। জরায়ুমুখের ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষে ‘ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, এন্টি ক্যান্সার ফোরাম মার্চ ফর মাদার, কমিউনিটি অনকোলজি সেন্টার’ যৌথভাবে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। এ বছর জরায়ুমুখের ক্যান্সার সচেতনতা মাস উপলক্ষে প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘বাল্য বিবাহে জোর না’ (বিগ নো টু আরলি ম্যারেজ)। বিশ্বে জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্তের প্রধান কারণ ‘হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস’-(এইচপিভি) হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্যবিয়েই এই রোগে আক্রান্তের অন্যতম কারণ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাবেরা খাতুন বলেন, দীর্ঘদিন জরায়ুমুখের ক্যান্সার নিয়ে কাজ করার সুবাদে আমার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করতে পারলে জরায়ুমুখের ক্যান্সার অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। সে কারণে তিনি বাল্যবিয়ে বন্ধে আইনের ‘বিশেষ ধারা’ উঠিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, এই ক্যান্সার নির্মূলে সরকার পপুলেশন বেইজ স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করতে পারে। ৩০ থেকে ৬০ বছরের নারীদের একটা লিস্ট করে তাদের স্ক্রিনিংয়ের জন্য ডাকতে হবে। প্রতি ৩ বছর পর পর টেস্ট করাতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ হলে তাকে চিকিত্সা দিতে হবে। এভাবে জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে ৩ ধাপে কাজ করতে হবে। প্রথম ৯ থেকে ১৪ বছর মেয়েদের টিকা দিতে হবে। এরপর সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা এবং ৩০ থেকে ৬০ বছরের নারীদের এই ক্যান্সার প্রতিরোধে ট্রেনিং করাতে হবে। যাদের ক্যান্সার হয়ে গেছে তাদের ক্যামো থ্যারাপি, রেডিও থেরাপির মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা যায়। এই ৩টি ধাপেই সরকারের ভূমিকা রাখতে হবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের রেডিও অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দুটো ক্যান্সার আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। এক জরায়ুমুখের ক্যান্সার অন্যটি ক্লোরেক্টাল ক্যান্সার। তিনি বলেন, একজন রোগী জরায়ুমুখের ক্যান্সার নিয়ে যখন আমাদের কাছে আসেন, তখন তার ক্যান্সারের বয়স ১০ থেকে ১৫ বছর। এই ক্যান্সার হওয়ার আগেই শনাক্ত করা সম্ভব ছিল এবং তখন সুস্থ করানো সহজ ছিল। তবে সচেতনতায় একটি অ্যাপের মাধ্যমে ভিডিও বার্তা বাংলায় পৌঁছে দিতে পারে সরকার।

হিস্টপ্যাথলজিস্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বাল্যবিয়ে কেন ঝুঁকিপূর্ণ এ প্রসঙ্গে বলেন, ১৬ বছরের আগে যদি যৌন সম্পর্ক হয় এবং প্রথম মাসিক শুরু থেকে একবছরের মধ্যে যদি যৌন সম্পর্ক হয়, তাহলে সেই মেয়ে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেশে ১১/১২ বছরেও বিয়ে হচ্ছে। জরায়ুমুখের ক্যান্সার হওয়ার ১৫ থেকে ২০ বছর আগে ভাইরাস আক্রমণ করে। ফলে ওই সময়ের আগে প্রতি ৩ বছর অন্তর টেস্ট করলে সেই নারী ঝুঁকির মধ্যে থাকেন না।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইপিডেমলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, ইউএনডিপি’র তথ্য মতে এখনো আমাদের দেশে ৫৪ ভাগ মেয়ের ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়। একটি মেয়ের নিজে পরিপূর্ণ না হতেই বিয়ে-সন্তানজন্ম দেওয়া এসব একের পর এক আঘাত জরায়ুমুখের ক্যান্সারের দিকে ধাবিত করে। সে কারণে বাল্যবিয়েকে জোরে না বলতে হবে চিকিত্সকসহ সবাইকে। কিছু লক্ষণ দেখে বোঝা যায়— তার মধ্যে জরায়ুমুখ দিয়ে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো নারীর হঠাত্ রক্তক্ষরণ শুরু হওয়া, লম্বা সময় নিয়ে রক্তক্ষরণ হওয়া, অথবা অনিয়মিত মাসিক হলে, অতিরিক্ত দুর্গন্ধযুক্ত সাদাস্রাব হওয়া, তলপেটে ব্যথা—এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে বলে জানান তিনি।

বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন রোটারি ইন্টারন্যাশনালের গভর্নর আবুল ফজল মো. আলমগীর, কণ্ঠশিল্পী সামিনা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ, ক্যান্সার সারভাইভার্স সংগঠন অপরাজিতার চেয়ারপারসন তাহমিনা গাফ্ফার, ওয়াইডব্লিউসিএ’র সদস্য মেরী মারগারেট রোজারিও প্রমুখ। সচেতনতা মাস উপলক্ষে কমিউনিটি অনকোলজি সেন্টার ১২ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর ৭/৯, লালমাটিয়া, ব্লক-বি তে বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে ভায়া টেস্ট ও স্ক্রিনিং করানো হবে। শুক্রবার সেন্টারটি বন্ধ থাকবে। এছাড়া প্রতি রবি ও সোমবার সেন্টারটিতে বিনামূল্যে ভায়া টেস্ট ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং করানো হবে। এছাড়া সরকারি মেডিক্যাল, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটসহ ৩০০ সেন্টারে বিনামূল্যে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের স্ক্রিনিং ও ভায়া টেস্ট করানো হয়।