দেশে নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-উত্তর উত্তেজনা কমে গেছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও বিতর্ক নিস্তেজ। পরাজিত পক্ষ বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের আন্দোলনের হুমকি-ধামকিও আর আগের মতো প্রবল নয়। ভারত ও চীন তো আগেই শেখ হাসিনার নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ এবং জাতিসংঘের কাছেও এই নির্বাচন বৈধতা প্রাপ্ত। বিএনপি-জামায়াতের মিত্র রাষ্ট্র পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ এই নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোটের মহাজয় সম্পর্কে কোনো আপত্তি তুলেছেন বলে আমার জানা নেই।
ড. কামাল হোসেন এবং তার দুই নন্দিভৃঙ্গি আ.স.ম রব ও মাহমুদুর রহমান মান্না নির্বাচনের আগে ব্যাঘ্রমূর্তি ধারণ করেছিলেন। এখন প্রমাণিত হয়েছে তারা পেপার-টাইগার্স বা কাগজের বাঘ। বাঘা সিদ্দিকী নামে পরিচিত কাদের সিদ্দিকী নির্বাচনের আগে হুঙ্কার দিয়েছিলেন, পয়লা জানুয়ারি তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের করে আনবেন। এখন প্রমাণ হয়েছে তিনি জঙ্গলের বাঘ নন, চিড়িয়াখানার বাঘ।
একাদশ সংসদের নির্বাচনে যোগ দিয়ে বিএনপি লাভবান হয়েছে। যদিও সংসদে তাদের সংখ্যাশক্তি মাত্র পাঁচজনের। এই সংখ্যাশক্তি তাদের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করবে। নির্বাচনের আগে তারা যেমন কথায় কথায় বলতেন, এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ত্রিশটি আসনও পাবে না। এই বিভ্রান্তি তাদের দূর হবে। আরেকটি উপলব্ধি তাদের ঘটবে। সাম্প্রদায়িকতার প্রচার, ভারত-বিদ্বেষের শ্লোগান এবং ইসলাম বিপন্ন হওয়ার ধুয়া তোলাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর মূলধন করা যাবে না।
জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতও বিএনপিকে আর শক্তি জোগাবে না। বরং এই আঁতাত এবং সাম্প্রদায়িকতার নীতির অনুসরণ বিএনপিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম লীগের মতো অস্তিত্ব বিলোপ ঘটাবে। বিএনপি যদি একাদশ সংসদে যোগ না দেয় এবং তার বর্তমান নীতি ও কৌশলের ব্যাপক পরিবর্তন না ঘটায় তাহলে দল হিসেবে এই বিলুপ্তির প্রক্রিয়া এখনই দেখা দেবে। ঐক্যফ্রন্ট যে ভাঙা কাচ তা তো প্রমাণিত হয়েছেই, প্রমাণিত হবে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবং জামায়াতেও ‘গ্রহণ’ দেখা দিয়েছে।
বিএনপি এখন তাদের পরাজয়ের জন্য দোষ চাপাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ঘাড়ে। আমার বলতে দ্বিধা নেই, ২০০১ সালে বিএনপি তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কব্জা করে দেশময় বিভীষিকার রাজত্ব সৃষ্টি দ্বারা যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছিল, তার সিকিভাগও এবারের নির্বাচনে হয়নি। একজন বিদেশি পর্যবেক্ষক বলেছেন, “এবারের নির্বাচনে যেটুকু অনিয়ম ও পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে, তা নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করেনি। সাবেক তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের নির্বাচনে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে।”
এই পর্যবেক্ষকের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে যেটুকু অনিয়ম ঘটেছে তা না ঘটলেও আওয়ামী লীগ জয়ী হতো। হয়ত বিএনপি আর ক’টা বেশি আসন পেত। তা সংসদের বিরোধী দল গঠনের মতো সংখ্যাশক্তিতে পৌঁছাত না। এটা বুঝতে পেরেই ভারত, চীন, রাশিয়া এবং পশ্চিমা দেশগুলো এই নির্বাচন মেনে নিতে বিলম্ব করেনি। ব্রিটেনসহ কোনো কোনো দেশ বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনের ব্যাপারে কিছু কিছু খুঁত ধরেছে, তা স্বচ্ছতা সম্পর্কিত। বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নয়।
নির্বাচনে বিএনপি’র পরাজয়ের অনেক কারণের মধ্যে একটি বড় কারণ নীতি ও নেতৃত্বহীনতা এবং নির্বাচনে যোগদানে সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি গ্রহণে অতি বিলম্ব। বিএনপি নেতৃত্ব এখনো বুঝতে পারছেন না, তাদের রাজনৈতিক নীতি ও নেতৃত্ব বাসি হয়ে গেছে। জামায়াত তাদের রাজনীতির বান্ধব হতে পারে, ভোট বান্ধব আর নয়। দেশের তরুণ প্রজন্মের চোখও এখন আর মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা দ্বারা আচ্ছন্ন নয়। তাদের দৃষ্টি নতুন প্রযুক্তির যুগের নব নব সম্ভাবনার দিকে। আওয়ামী লীগ তবু তাদের সামনে আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশের একটা স্বপ্ন তুলে ধরতে পেরেছে এবং দেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নের একটা অবিশ্বাস্য ধারা তৈরি করতে পেরেছে। বিএনপি তাদের শাসনামলে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের দুর্গ হাওয়া ভবন তৈরি ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। এটাও বর্তমান নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করেছে।
বিএনপি’র উচিত ছিল, নির্বাচনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি আরও আগে গ্রহণ এবং খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে নিজেদের মধ্য থেকে কালেক্টিভ লিডারশিপ তৈরি দ্বারা তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের সামনে কর্মসংস্থান এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরা। তা তারা পারেননি। কালেকটিভ লিডারশিপ গড়ে তোলা দূরের কথা, মওদুদ-ফখরুল মতবিরোধ থেকে শুরু করে দলের মধ্যে আরও বিবাদ ও অনৈক্য যেন পরবর্তী ঐক্যফ্রন্ট গঠনকে প্রহসনে পরিণত করেছিল।
ঐক্যফ্রন্ট গঠন দ্বারাও বিএনপি দেশবাসীর সামনে শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো শক্তিশালী জাতীয় নেতৃত্ব খাড়া করতে পারেনি। ফখরুল ও রিজভী জাতীয় নেতৃত্ব দানের মতো অবস্থানে এখনো উঠে আসেননি। নেতৃত্বের এই শূন্যতা পূরণের জন্য কালেকটিভ লিভারশিপ গড়ার বদলে তারা হায়ার করলেন ড. কামাল হোসেন, রব ও মান্নার মতো এমন নেতাদের, জনগণের কাছে যাদের কোনো ক্রেডিবিলিটি নেই। বরং এদের যেটুকু ক্রেডিবিলিটি অবশিষ্ট ছিল, তাও বিএনপি-জামায়াত শিবিরে যোগ দিয়ে তারা হারিয়েছেন।
নীতি ও নেতৃত্ব দুই ক্ষেত্রেই শূন্যতা নিয়ে বিএনপি কিভাবে আশা করেছিল তারা নির্বাচনে জয়ী হবে? আর নির্বাচনী প্রচারণাতেও কেবল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে অনবরত কটুকাটব্য করা ছাড়া সুষ্ঠু ও বাস্তব কোনো কর্মসূচি তারা নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে তুলে ধরেননি। যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ধুয়া তারা ধরেছিলেন, তার কোনো নজির তাদের অতীতের শাসনামল থেকে দেখাতে পারেননি, ভবিষ্যতের জন্যও তার রূপকল্প আঁকতে পারেননি। ড. কামালের সুশাসনের থিয়োরি সোনার পাথর বাটি না অশ্বডিম্ব তারও ব্যাখ্যা কেউ করেননি।
আমার লিখতে দ্বিধা নেই, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভরাডুবি আমাকে আশান্বিত ও আনন্দিত দুই-ই করেছে। আমি সংসদে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বিরোধী দল চাই। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের মৌলিক আদর্শের শত্রুপক্ষের দ্বারা গঠিত বিরোধী দল চাই না। সংসদে এমন বিরোধী দল থাকা দরকার, যারা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করবেন। নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসবেন, কিন্তু তারা বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল আদর্শে অবিশ্বাসী হবেন না। বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের ছায়া রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করবেন না। অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের উচ্ছেদ ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ আমাদের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের ৪০ বছরেও দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে ওঠেনি। রূপকথার রাক্ষসীর সুন্দরী নারীর মুখোশ ধারণ করে রাজার বাড়ির সকলকে একে একে ভক্ষণ করার মতো, বাংলাদেশেও স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের শত্রুরা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সমর্থক সেজে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় ছিল এবং একে একে রাষ্ট্রের স্থপতি ও জনগণের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের আদর্শগুলো ধ্বংস করেছে। কোনো সভ্য দেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা লাভের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতার শত্রুরা এসে ক্ষমতা দখল করেছে তার কোনো নজির নেই।
কিন্তু বাংলাদেশে তাই ঘটেছে। দেশের রাজনীতির গণতান্ত্রিক পোলারাইজেশন ঘটেনি। ঘটেছে দুই ভাগে। একদিকে স্বাধীনতার আদর্শের পক্ষের রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে তার বিপক্ষের শত্রুদল। আমাদের সুশীল সমাজের সুবিধাবাদী অংশটি একেই গণতান্ত্রিক পোলারাইজেশন আখ্যা দিয়ে দুই পক্ষকেই একই পাল্লায় চাপিয়ে স্বাধীনতার শত্রুদেরও স্বাধীনতার মিত্রদের সমান মর্যাদা দিয়ে শত্রুর দলকেই এবারের নির্বাচনেও রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের কাজে সাহায্য জুগিয়েছেন।
অবশ্য এই ষড়যন্ত্র এবার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি জামায়াত যদি রাজনীতি থেকে নির্মূল হয় তাহলে দেশের রাজনীতিতে সুষ্ঠু পোলারাইজেশন ঘটবে। আওয়ামী লীগের বিকল্প গণতান্ত্রিক দল গড়ে উঠবে। তখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুটি গণতান্ত্রিক ধারায়। তাতে যে পক্ষই জয়ী হোক তাতে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তা বিপন্ন হবে না। দেশে প্রকৃত আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। জনগণের এটাই প্রত্যাশা এবং এই নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোটের জয়লাভে দেশের রাজনীতির সুষ্ঠু পোলারাইজেশন এবং তার ফলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার সূচনা হলো।
কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই বিরোধী দলশূন্য সংসদ কাম্য নয়। তবু “দুষ্ট গোরুর চাইতে শূন্য গোয়াল ভালো।” আওয়ামী লীগের বিজয় প্রমাণ করেছে, দেশবাসী তাদের ওপর আস্থা পুনঃস্থাপন করেছে। এই আস্থার মর্যাদা তাদের রাখতে হবে। আওয়ামী লীগ দেশকে দারিদ্র্য ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এবার তাদের যুদ্ধ অবশ্যই দুর্নীতির মহারাক্ষসের বিরুদ্ধে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার। সেই সঙ্গে গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গঠনের কাজেও আওয়ামী লীগের উচিত হবে সর্বাত্মক সাহায্য ও সহযোগিতা দেওয়া। শেখ হাসিনা এখন দলনেতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। এই জাতীয় নেতার ভূমিকায় তিনি সফল হোন এবং তার নেতৃত্বে দেশে সুষ্ঠু দ্বি-দলীয় গণতন্ত্র গড়ে উঠুক এটা আমার প্রার্থনা।
[ লন্ডন, ১২ জানুয়ারি, শনিবার, ২০১৯ ]
