নতুন মজুরি কাঠামোর বাস্তবায়ন ও মজুরি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তা সংশোধনের দাবিতে আবারো রাজধানীর মিরপুর ও আশুলিয়ার বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন পোশাক শ্রমিকরা। রাজধানী, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পোশাক শ্রমিকরা গত রবিবার থেকে টানা এ বিক্ষোভ করছেন। গতকাল শনিবার রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকালে তেমন কোনো সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটলেও আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল ব্যবহার ও শ্রমিকদের লাঠিপেটা করেন। তবে শ্রমিকরা পুলিশের ধাওয়া খেয়ে বিক্ষিপ্তভাবে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে প্রায় ১৫টি গাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে ১০ জন শ্রমিক আহত হয়। এ পরিস্থিতিতে গাজীপুরের অন্তত অর্ধশত গার্মেন্টস শনিবারের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাভার আশুলিয়ায় পুলিশের পাশাপাশি ৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ ও বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৮টার দিকে আশুলিয়ার বেরন এলাকার ইয়াগী বাংলাদেশ লিঃ কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করে কর্মবিরতি পালন করা শুরু করে। এরপর তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সকাল ৯টার দিকে কারখানা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় স্টারলিং অ্যাপারেলস, উইন্ডি অ্যাপারেলস, এআর জিন্সসহ ৩০টি কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক। তারা আশুলিয়ার কাঠগড়া, কুটুরিয়া, জামগড়াসহ কয়েকটি এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে রাখেন। এসময় শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে প্রায় দশটি যানবাহনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। এতে বিভিন্ন গাড়িতে থাকা প্রায় পাঁচ যাত্রী আহত হয়। খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট পাটকেল ছুঁড়লে পুলিশ-শ্রমিকদের লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহার করে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। ছত্রভঙ্গ শ্রমিকরা তখন সড়কে চলাচলরত গাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে প্রায় ১৫টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংঘর্ষে ১০ জন শ্রমিক আহত হয়। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে।
শিল্প পুলিশের এসপি সানা শামিনুর রহমান জানান, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়ক অবরোধে চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিল্প এলাকায় পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন রয়েছে।
এদিকে বেলা সাড়ে সোয়া ২টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় আরেক দফা বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা। দুপুরে খাবার ছুটির সময় নরসিংহপুর এলাকার কয়েকটি গার্মেন্টসের কয়েক শত শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। পুলিশ এসে শ্রমিকদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। ১৫ মিনিটের ওই অবরোধে সড়কের দুই পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে সকাল সাড়ে ১০টা থেকেই রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১৪, টোলারবাগ, বাংলা কলেজের সামনে ও টেকনিক্যাল এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন আশপাশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা। তারা মিরপুর-১৪ এলাকার রাস্তা ও বাংলা কলেজ-টেকনিক্যাল মোড় এলাকার সড়কে পোশাকশ্রমিকরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এসময় বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা একটি মোটরসাইকেল ও একটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করে। এসময় ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ ছিলো। এতে আশপাশ এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। তবে মিরপুর ১৪ ও উত্তর ইব্রাহিমপুর এলাকায় কয়েকটি গার্মেন্টস ভাঙচুর করেন বিক্ষোভকারীরা। দুপুর ২টা থেকে ভিন্ন ভিন্ন এলাকার শ্রমিকরা দাবি পূরণের আশ্বাসে সরে যেতে শুরু করেন। বিকালে মিরপুর এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টেকনিক্যাল মোড়ে নামেন ওই এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। পরে সেখান থেকে সরকারি বাঙলা কলেজের সামনের সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনকারীরা। এসময় ঢাকার অন্যতম প্রবেশপথ গাবতলী থেকে সব গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি মিরপুর ১ নম্বর থেকে টেকনিক্যাল সড়কেও যান চলাচল বন্ধ থাকে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় সেখানে। পুলিশ তাদের সরে যেতে অনুরোধ করলেও তারা আন্দোলন চালিয়ে যান। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিরপুর বাঙলা কলেজ ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীও আন্দোলনকারীদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকরা বেবিলন পোশাক কারখানায় ইটপাটকেল ছোঁড়ে ও কয়েকটি ফুলের টব ভাঙচুর করে। এছাড়া অ্যাপারেলসের সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলেন বিক্ষোভকারীরা। দুপুর ১টার দিকে কয়েকটি পোশাক কারখানার মালিক পক্ষ এসে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করলে তারা সড়ক থেকে সরে যান।
ওদিকে সকাল ৯টার দিকে মিরপুর ১৪ নম্বর, কচুক্ষেত, ইব্রাহিমপুর এলাকার সড়কেও বিক্ষোভে নামেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। দুপুর ২টা পর্যন্ত ওই এলাকার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কারা। এসময় সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ ছিলো। বিকল্প সড়কে যান চলাচল কারায় যানজট সৃষ্টি হয়। কাফরুলের ডায়ানা গার্মেন্টস ও উত্তর ইব্রাহিমপুরের ব্যানেক্স এ্যাপারেল লি. কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে যোগ না দেওয়ায় কারখানা দুটি ভাঙচুর করেন আন্দোলনকারীরা। পরে পুলিশের ধাওয়ায় তারা পালিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ব্যানেক্স অ্যাপারেল কারখানার নয় তলা ভবনের ছয়তলা পর্যন্ত উঠে পড়েছিলেন আন্দোলনকারীরা।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. জামাল হোসেন বলেন, গত কয়েকদিনের মতো গতকালও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ করেন। পোশাক শ্রমিকরা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সড়কে অবস্থান নিলেও দুপুরে দিকে গার্মেন্টস মালিক ও পুলিশ প্রশাসনের আশ্বাসে কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই শ্রমিকরা সরে যান। বিকাল ৩টার দিকে প্রায় পুরো এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসব এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে পুরো এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি ও যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
গতকাল রাজধানীর মিরপুরে এক অনুষ্ঠানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের এ বিক্ষোভের ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে ইন্ধন দিয়ে থাকে, তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে এইভাবে রাস্তার ওপর বিশৃঙ্খলা করে কেউ জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করবেন না। কারণ এটি যদি চলতে থাকে, আমরা খুঁজে বের করব, ইন্ধনদাতা কারা। কেন এটা করা হচ্ছে।
কমিশনার বলেন, অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে জনদুর্ভোগ কেন করা হচ্ছে? এরই মধ্যে আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা (ডিবি) সংস্থাকে নির্দেশ দিয়েছি, এটা খতিয়ে দেখার জন্য। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি এই ধরনের ষড়যন্ত্র করে থাকে, তাদের চিহ্নিত করে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
