গার্মেন্টস খাতে চলমান অসন্তোষ নিরসনের লক্ষ্যে গতকাল শনিবার সচিবালয়ে মজুরি পর্যালোচনা কমিটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় শ্রমিকপক্ষ এ খাতের সাতটি গ্রেডে মূল মজুরি বিদ্যমান ৫১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে তিনটি গ্রেডে মোট মজুরি বাড়ানোর দাবিও জানানো হয়েছে। অবশ্য এই হারে বাড়ানোর পক্ষে নন মালিকপক্ষ। তবে গতকালের সভায় কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। সূত্র জানিয়েছে, শ্রমিকপক্ষের প্রস্তাব ও মালিকপক্ষের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আজ রবিবার বিশদভাবে পর্যালোচনা করবে শ্রম মন্ত্রণালয়। আগামীকাল নাগাদ এ বিষয়ে একটি সমাধানে পৌঁছার চেষ্টা চলছে।
পর্যালোচনা কমিটির সদস্য হিসেবে সভায় উপস্থিত ছিলেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন। সভা শেষে গতকাল ইত্তেফাককে তিনি বলেন, নতুন মজুরি কাঠামোতে মূল মজুরি ৫১ শতাংশ বাড়ানোর কথা রয়েছে। আমরা এটি ২০১৩ সালের ন্যায় ৬০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছি। এছাড়া তিন, চার ও পাঁচ নম্বর গ্রেডের বিষয়টিকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া। তবে ছয় ও সাত নম্বর গ্রেডের মজুরি নিয়ে যেহেতু বিশেষ আপত্তি নেই, সেজন্য এই দুটি গ্রেডে মোট মজুরি ঠিক রেখে মূল মজুরি সমন্বয় করার (৬০ শতাংশ) প্রস্তাব দিয়েছি।
এদিকে কমিটিতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন মনে করেন, মূল মজুরি নিয়ে কিছু ভুল বুঝাবুঝির কারণে সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, দুই একটি গ্রেড নিয়ে তারা সংক্ষুব্ধ। তারা বলেছে, একটি গ্রেডে বর্তমানের চাইতে মূল মজুরি ৪০ টাকার মতো কম হয়। আমাদের মতে কম হয় না। তবুও ওই বিষয়টিই কেবল পর্যালোচনা করা যেতে পারে। শিল্পের সক্ষমতাও তো দেখতে হবে।
মালিকপক্ষের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, ২০১৩ সালে এ খাতের শ্রমিকদের পাঁচ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্টের বিষয়ে আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়। এর আগে যতগুলো মজুরি বোর্ড হয়েছিল, কখনো ইনক্রিমেন্ট ছিল না। কিন্তু গত পাঁচ বছরে শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্টের কারণে মূল মজুরি বেড়ে গেছে। ফলে নতুন কাঠামোতে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান মজুরির কাছাকাছি কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যমান মজুরির চাইতেও কম। এই ইনক্রিমেন্টের বিষয়টি এখন মালিকপক্ষের কাছে নতুন অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। তারা মনে করেন, ইনক্রিমেন্ট না থাকলে এবার হয়তো শ্রম অসন্তোষের মতো ঘটনা ঘটতো না। সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বছর বছর ইনক্রিমেন্ট হবে আবার নির্দিষ্ট সময় শেষে মোট মজুরি বাড়বে - তা তো হয় না। যে কোনো একটি রাখতে হবে। অবশ্য শ্রমিক নেতারা বলছেন, ইনক্রিমেন্ট কমানো কিংবা বাতিলের কোনো সুযোগ নেই।
‘আন্দোলনে স্বার্থান্বেষী মহল ঢুকেছে’
এদিকে শ্রমিকদের মজুরি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায়ও আন্দোলন কিংবা সহিংস আচরণের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে - তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শীর্ষস্থানীয় বেশিরভাগ শ্রমিক সংগঠনের নেতারাই শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানানোর পরও গত কয়েকদিনে বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি দুই একটি কারখানার শ্রমিকরা নেমে অন্য কারখানার শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নামতে উস্কানি দেওয়া কিংবা বাধ্য করা, কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, শ্রমিকদের না পোষালে অন্য কারখানায় যেতে পারে। কিন্তু ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কেন করবে। এর মধ্যে স্বার্থান্বেষী মহল ঢুকেছে। এর ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে কারখানার নিরাপত্তা চাই। এর আগে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আফরোজা খানও বলেন, মজুরি কাঠামোর কারণে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে তা নয়, এর পেছনে অন্য ঘটনা রয়েছে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মজুরি কাঠামোর চাইতে বেশি বেতন দেওয়া হয়, এমন একটি কারখানা ভাঙচুর করা হয়েছে। অর্থনীতির মূলভিত্তি হচ্ছে গার্মেন্টস খাত। এ খাতকে ধ্বংস করার জন্য একটি চক্র পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে।
আইবিসি’র মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, সরকার বিভিন্ন সময়ে বলেছে কারো ইন্ধনে কিংবা পেছনে কেউ কলকাঠি নাড়ছে। আমরা চাই, এ ধরনের কিছু থাকলে সরকার তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনুক।
