লি পেনকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ম্যাক্রো

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২০, ২১:২৭

এম এ আলআমিন

 

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো সম্প্রতি দেশটিতে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রতি অভিযোগ করে বলেছেন, তারা  ‘সমাজের ভেতর সমাজ’ তৈরি করছে। তিনি এমন মন্তব্যও করেন যে, সারা বিশ্বেই ইসলাম সংকটের মুখে পড়েছে। ফরাসী মুসলিমদের ‘সমান্তরাল সমাজ’ গঠনের চেষ্টা প্রতিহত করার জন্য ম্যাক্রো কিছু কর্মসূচিও তুলে ধরেন। 

বলা বাহুল্য, ম্যাক্রোর এ বক্তব্য দেশে-বিদেশে বিতর্কের জন্ম দেয়। ৬ কোটি ৭০ লাখ জনঅধ্যুষিত ফ্রান্সে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মুসলিমের বসবাস। ম্যাক্রো একজন পপুলিস্ট নেতা, নিজের পপুলিজমকে রক্ষার জন্য তিনি রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টির ঝুঁকিটি নিয়ে থাকতে পারেন অনেকে মনে করেন। ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক রাখা ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অংশ হলেও ম্যাক্রোর এই বক্তব্য কিন্তু তা প্রতিফলিত করে না। একজন রাষ্ট্র প্রধান কোনো ধর্মীয় কম্যুনিটিকে উদ্দেশ্য করে এমন বক্তব্য প্রত্যাশিত। কিন্তু পরিস্থিতি এমন, ধর্ম নিয়ে বক্তব্য রাখা এখন রাজনীতির অংশ। ইউরোপের রাজনীতিতে ডানপন্থিদের কণ্ঠস্বর ক্রমেই জোরাল হচ্ছে। এ কারণে তথাকথিত পপুলিস্টদের পক্ষে স্রোতের বিপরীতে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

পুরো ইউরোপে মুসলিমরা এখন সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে একটি চ্যালেঞ্জের মুখে আছে— তা বোধ করি অস্বীকার করার উপায় নেই। মুসলিমদের সম্পর্কে এ ধারণা তৈরি করা হচ্ছে যে, তারা ইউরোপীয় মূল্যবোধ পালটে দিতে চাইছে। প্রশ্ন উঠতে পারে মহাদেশটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা সত্যিকারের ইউরোপীয় মূল্যবোধ ধারণ করে। উল্লেখ্য, শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টানদের মূল্যবোধকে ইউরোপীয় মূল্যবোধের সমার্থবোধক মনে করা হয়। এক্ষেত্রে মুসলিমদের দেখা হয় একরকম ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে। বিষয়টি ফ্রান্সের রাজনীতির ওপর গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। বিষয়টিকে কেনন্দ্র করে রাজনীতি এখন ডান ও বাম ধারায় বিভক্ত।

বলা বাহুল্য বিশ্ব জুড়ে মুসলিমরা এখন বহু সমস্যার সম্মুখীন। যুদ্ধবিগ্রহের শিকার কোটি কোটি মুসলিম যেমন ভিন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক মুসলিম দেশে গণতন্ত্র অনপুস্থিত। এগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এটি স্পষ্ট নয় যে, ম্যাক্রো তার সরকার যে নয়া নীতি ঘোষণা করেছেন তাতে যে সব দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন আছে, তাদেও সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে পরিষ্কার কিছু বলা হয়নি। ম্যাক্রো যদি তার পররাষ্ট্রনীতিতে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য সুশাসনকে শর্ত হিসেবে ঘোষণা দিতেন তাহলে তার ঐ বক্তব্য ততটা বিতর্কের জন্ম দিত না, কিন্তু তিনি সে পথে হাঁটেননি। তিনি বলেছেন, ইসলাম সংকটে আছে। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক বাগড়ম্বর হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। স্পষ্টত অনুমেয় তিনি ২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করেছেন। ডানপন্থি নেত্রী মেরি লি পেনের সঙ্গে জনপ্রিয়তার দৌড়ে তিনি এখন প্রায় সমান সমান অবস্থানে রয়েছেন।

উদার মূল্যবোধ সম্পন্ন ইউরোপীয় রাজনীতিবিদদের কাছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক ইস্যু হিসেবে মুসলিম কমিউনিটিকে ঘায়েল করার পক্ষপাতী তারা নন। সত্যিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যা বলে, যে কোনো চিন্তাধারাকে বিপরীত উন্নত চিন্তাধারা দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে, তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে নয়। ইউরোপের রাজনীতিতে হাওয়া এখন ডানপন্থিদের অনুকূলে একথা ঠিক, কিন্তু তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য লিবারেলদের যে ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে এগিয়ে আশা সবাই আশা করে, তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। টুলুস ওয়ান ক্যাপিটোল ইউনিভর্সিটির আইন বিশেষজ্ঞ রিম সারাহ অ্যালাউন মনে করেন, ফরাসি রাজনীতিতে ডানপন্থিরা যে খুব সুবিধা করতে পারবে তা নয়, বরং তাদের যে চিন্তুাভাবনা ছড়িয়ে দিয়েছে সেটাই জিইয়ে থাকবে। বিশেষ করে মুসলিম বিরোধী রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর রাজনৈতিক নেতাদের যেমন তেমনি মিডিয়ারও উপজীব্য বিষয়। এটি রাজনীতিকদের ভোটারদের মনে সবসময় জাগরুক রাখে।

ম্যাক্রোর নেতৃত্বাধীন এন মার্চে এখনো ফ্রান্সের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তারা এমন দাপটের সঙ্গে টিকে থাকবে কি-না, তা নিয়ে দলের মধ্যে সংশয় আছে। যে কারণে এই দলের অনেক নেতাকে সময় সময় উগ্র ডানপন্থিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। তারা ২০১৫ সালের নভেম্বরে মুসলিম জঙ্গিদের হামলার কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু ২০১৯ সালে ক্রাইস্টচার্চ হামলার কথা বলেন না।