১৮ অক্টোবর। স্বপ্নরঙিন, তুমুল আনন্দের দিন। এই দিনে বাংলার সবুজ-শ্যামল বনে পাতাদের পাশে ফুলগুলো আরো বেশি রঙিন হয়ে হেসে ওঠে। পাখিরা বসায় গানের আসর। মাঠের বুকে নেচে বেড়ায় ঘাসফড়িং—তিড়িং তাতা, তিড়িং তাতা। খোকাখুকি থেকে শুরু করে বুড়োবুড়ি—ছেটোবড়ো সব্বাই মেতে ওঠে আনন্দে।
১৯৬৪ সালের এই দিনে ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে জন্মেছিল চাঁদের মতো সুন্দর, ফুলের পাপড়ির মতো তুলতুলে এক রাজকুমার। শেখ রাসেল তার নাম। তার বাবা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তার মা। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে রাসেল ছিল সবচেয়ে ছোট। শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা এবং শেখ রাসেল। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা বর্তমানে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
রাসেলের জন্মের পর আনন্দজোয়ারে ভাসতে থাকে সারা বাড়ি। কার আগে কে কোলে নেবে, কে আদর করবে—এই নিয়ে যেন চলতে থাকে প্রতিযোগিতা। রাসেল কখনো বা একটুখানি ব্যথা পেলে, সে ব্যথা এসে লাগত সবার হূদয়ে। তাকে ঘিরে বাবা, মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন—সবার মনে জেগে ওঠে নতুন নতুন স্বপ্ন।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত। বঙ্গবন্ধু রাসেলের বই পড়ে পড়ে শোনাতেন শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে। সেই বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সাথে মিলিয়ে ছোট সন্তানের নাম রাখলেন রাসেল।
অসীম আদরে বড়ো হতে লাগল সবার প্রিয় রাসেল সোনা। সবুজ পাতা আর পাখি দেখতে তার খুব ভালো লাগত। ফুলের সাথে হাসত। প্রজাপতির পেছনে দৌড়াত। তার একটি সাইকেল ছিল। টুং টাং টুং টাং করে চালিয়ে দারুণ মজা পেত। সাথে খেলত পাশের বাড়ির দুই ভাই আদিল ও ইমরান। কাজের মেয়ে রমাও ছিল খেলার সাথি। আর কবুতরের বাকবাকুম ডাক শুনতে ভালো লাগত তার। একটা পোষা কুকুর ছিল। নাম টমি। টমিকে নিয়েও খেলত। কবুতর ও টমিকে নিজ হাতে খাবার দিত। রাসেলের আরো একটা শখ ছিল—মাছ ধরা। মাছ ধরে ধরে ছেড়ে দিত। এটাও ছিল তার একটা খেলা। আরো অনেক রকম খেলা খেলত সে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটা দিতে পারত খুব সুন্দর করে। সে ইউনিভার্সিটি ল্যাবটেরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ত। হয়ে উঠেছিল খুব মেধাবী ছাত্র। তাকে যদি কেউ প্রশ্ন করত, বড়ো হয়ে তুমি কী হতে চাও? হাসিমুখে বলত, আমি আর্মি অফিসার হব।
চোখমুখভরা হাজার স্বপ্নছবি ঝলমল করা সেই সোনার শিশু শেখ রাসেলের জন্মদিন এলে আমরা সবাই আনন্দে ভাসতে থাকি। ফড়িংয়ের মতো নেচে ওঠে আমাদের মন।
কিন্তু হঠাত্ করেই চোখ ভিজে যায় জলে। বেদনায় ছেয়ে যায় মনের আকাশ। যখন দেখি, চাঁদের মতো সেই রাজকুমার আমাদের মাঝে নেই, তখন কি আমরা ভালো থাকতে পারি? পারি না।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে একদল বিপথগামী সৈনিক পরিবারসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। ছোট্ট রাসেলকেও ওরা বাঁচতে দেয়নি। তখন রাসেলের বয়স হয়েছিল মাত্র ১০ বছর ৯ মাস সাতাশ দিন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। তার দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে যান।
ঘাতকদের তাণ্ডবে ভয় পেয়ে রাসেল কেঁদে কেঁদে বলেছিল, ‘আমি মায়ের কাছে যাব। আমি মায়ের কাছে যাব।’ ওরা রাসেলকে মা-বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচাসহ সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। প্রিয় স্বজনদের রক্তাক্ত লাশ দেখে রাসেল দু’ চোখ জলে ভাসিয়ে মিনতি করে বলেছিল, ‘তোমরা আমাকে হাসুপা’র (শেখ হাসিনা) কাছে পাঠিয়ে দাও’। কিন্তু পাষাণ ঘাতকদের কানে পৌঁছায়নি না সেই কান্না। ওদের নির্মম বুলেটের গুলি কেড়ে নেয় রাসেলের সবুজ প্রাণ।
শেখ রাসেল আমাদের ভালোবাসার নাম। প্রিয় নাম। তাকে ভোলা যায় না। একারণেই তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে অজস্র ছড়া-কবিতা-গল্প, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, উপন্যাস। হয়তো পৃথিবীর আর কোনো শিশুকে নিয়ে এত বিপুল পরিমাণ সাহিত্য রচিত হয়নি। সে মরেও বেঁচে আছে সবার হূদয়ে। বেঁচে আছে বাংলার লক্ষ-কোটি কোমলমতি শিশুর মুক্তোদানার মতো ঝলমল হাসির মাঝে। এইভাবে রাসেল সোনা বেঁচে থাকবে কাল মহাকাল।
প্রতিকৃতি অঙ্কন : সোহেল আশরাফ
