কবি হাসান হাফিজ জন্মদিনে শুভেচ্ছা

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২০, ২১:০৩

হাসান হাফিজ, সাহিত্যের নানা শাখায় সক্রিয় একজন কবি। সাহিত্যচর্চার শুরু হয়েছিল প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল আগে, ছড়া রচনার মধ্য দিয়ে। গোলাম মাওলা শাহজাদা, এই নামে শুরুটা। পুরনো দিনের ছড়াকারেরা ভোলেননি তার সেইসব স্বাদু ছড়া। গত শতকের সত্তর দশকের গোড়ার দিকে তিনি কবিনাম নেন হাসান হাফিজ। বাংলাদেশের পাঠকমহলে সুপরিচিত এই নাম। কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ৫০ ছাড়িয়েছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এখন যৌবন যার’। যতদূর জানি সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থ ‘জ্বলো তুমি ৭১’। এছাড়া ছোটদের জন্য লেখা ছড়া-কবিতা-অনুবাদ-জীবনী মিলিয়ে তাও প্রায় চার ডজনেরও বেশি গ্রন্থ রয়েছে হাসান হাফিজের সাহিত্যভাণ্ডারে।

একজন পেশাদার সাংবাদিক, তা-ও আবার রিপোরর্টিং যার দায়িত্ব, সেই ব্যস্ততম মানুষটি এত লেখা কীভাবে লেখেন, সে বড়ো বিস্ময়ের কথা! সহজাত লেখার ক্ষমতা না থাকলে এমন অনর্গল  লিখে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তার ঈশপের গল্পের কাব্যরূপায়ণ দেখে।

হাসান হাফিজের কবিতার বিষয়ও বিচিত্র। সমাজ-দেশ-সংস্কৃতি-অবক্ষয়, প্রেম-প্রকৃতি-নারী-নিসর্গ আধ্যাত্মিকতাসহ আরো কত কতই না বিষয়! তার কবিতার প্রবণতা হচ্ছে বিষয়প্রাধান্য। যেকোনো বিষয়কেই তিনি কবিতা করে তোলেন তার নিজস্ব বাক্ভঙ্গিতে। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, আধুনিক কবিতার যে আলো-আঁধারির রহস্যময়তার কালোয়াতি, সে পথে যান না তিনি। তার গন্তব্য সহজ বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে লিরিকের সংযোজক পথ। গীতিময়তাই তার আরাধ্য মনে হয়েছে। বিশেষ করে প্রেমের কবিতায় সেই সুর বেজে উঠেছে আরো উচ্চগ্রামে। তার ‘নির্বাচিত ১০০ প্রেমের কবিতা’ গ্রন্থের প্রথম কবিতায়ই সেই সুর ব্যঞ্জিত :

ফুলের মরণ কোথায় লিখেছি কবে

খুব সম্ভব রমণীরই খোঁপা হবে

তার ঘনচুলে বাসা বেঁধেছিল এক নদী

বিরহের স্রোতে কুলকুলু নিরবধি

 (অপর জনমে হয়তো)

বাংলা কবিতার মধ্যযুগীয় পদাবলি সাহিত্য তথা গীতিকবিতার ঐতিহ্যও হাসান হাফিজ নিঃসঙ্কোচে প্রয়োগ করেন। ওই একই কবিতার শেষ চার চরণে পাই :

দু’জনা দুঁহুকে খুবই ভালোবেসে

মেনে নেয় বিচ্ছেদ

অপর জনমে হবেই মিলন

ভেবে ভুলে যায় খেদ।

প্রেমের এই শাশ্বত আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষার এই সরলতা তার প্রেমের পদাবলিসমূহে পাঠকসংযোগ বাড়াবে সন্দেহ নেই। কবি হাসান হাফিজ ছড়ার ছন্দও ব্যবহার করেছেন তার বহু কবিতায়। প্রেমের কবিতা থেকেই একটি উদ্ধৃতি দিই :

ও মনোচোর/ তুমি কি ঘোর!/আলো-আঁধার হাতড়ে ফিরি/আলিঙ্গনের শ্যাওলাসিঁড়ি/ডুবতে ডুবতে/জখমি হূদয়/খুঁড়তে খুঁড়তে একজনমে সম্ভব কি ফেরা?

(মৃত্যুর চেয়ে ভয়ঙ্কর)

কবি হাসান হাফিজ লিরিক্যাল কবিতায়ই স্বচ্ছন্দ। কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ যে মন্তব্য করেছেন তার কবিতা প্রসঙ্গে, সে মন্তব্যের একটি অংশ ১০০ প্রেমের কবিতার বইয়ের ফ্ল্যাপে উদ্ধৃত হয়েছে। কিছুটা তুলে ধরা যাক :

“গদ্যগ্রন্থ ‘বিদেশিনী বধূ’তে যে হাসান হাফিজের উপস্থাপন, কবিতার হাসান হাফিজ তা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। শব্দের ছন্দের বিষয়ের সৃজনে নির্মাণে তিনি এখানে কবি, পরিপূর্ণত কবি...। তার উপান্ত কবিতা মরমিয়তাকে স্পর্শ করে চলে যাচ্ছে আরো দূরে। তবে সর্বাবস্থায় তিনি  লিরিক কবি, গীতলতা তার কবিতার কেন্দ্রচারিত্র্য।”

এই গীতিময়তার ঝুঁকিপূর্ণ পথ ধরেই নিরন্তর সৃজনে মগ্ন কবি হাসান হাফিজ। ঝুঁকিপূর্ণ এ কারণে যে, আধুনিকেরা এই গীতিময়তার বিরুদ্ধে ৫০ বছর ধরে যে প্রতিবন্ধকতার ব্যারিকেড সৃষ্টি করে চলেছেন, তাতে এ পথে হাঁটতে হলে নানা কৌশলের আশ্রয় নেওয়া অনিবার্য। বিশেষ করে ভাবার্থ আর বাচ্যার্থর বহুমাত্রিকতায় যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

কবির জন্মদিনে (জন্ম : ১৫ অক্টোবর ১৯৫৫) তার কাব্য আলোচনা অন্বিষ্ট ছিল না। দীর্ঘদিন দৈনিক বাংলায় কাজ করেছি একসঙ্গে। আবার জনকণ্ঠেও তাকে পেয়েছি নতুন করে। কাব্য ও সাংবাদিকতার প্রিয় সহযোগীর জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানানোই মুখ্য। যে কারণে তার নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘জ্বলো তুমি ৭১’ নিয়েও আলোকপাতের সুযোগ হলো না এই স্বল্প পরিসরের আলোচনায়। সবশেষে বলি, ৬৬তম জন্মদিনপরবর্তী সময়েও দেদীপ্যমান থাকুক কবিতার উজ্জ্বল তৃষ্ণা। পথ প্রসারিত হোক শতবর্ষে নিরন্তর সৃজন সক্ষমতা সঙ্গী করে। জয়তু হাসান হাফিজ।

হাসান হাফিজ, জন্ম :১৫ অক্টোবর ১৯৫৫