আসার একটি নির্দিষ্ট দিনক্ষণ থাকলেও যাবার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। নবি, রাসুল, রাজা, সেনাপতি সবাইকে একটি নির্দিষ্ট সময় অবস্থানের পর চলে যেতে হয়েছে। সম্প্রতি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন প্রখ্যাত লেখক গবেষক পিরে কামিল অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ)। কর্মের আলো সমাজে প্রতিফলিত হলে সমাজ সে জীবনকেও আলোকিত করে তোলে। উপমহাদেশে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্ধকার দূরীভূতে যারা কালে কালে প্রজ্ঞা ও চেতনার আলোয় মানুষকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে পির বা অলি-আউলিয়াগণ অন্যতম। বিংশ শতাব্দীর যেসব অলি উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে প্রজ্ঞার বীজ বুনেছেন অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ) তাদের মধ্যে সমৃদ্ধ। তার বংশের অনেক অলি-আউলিয়া ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ইতিহাস গবেষণায় জানা যায়, উক্ত বংশের পূর্বপুরুষ ত্রয়োদশ খ্রিষ্টাব্দে আরবের মক্কা নগর থেকে এসে দিল্লিতে আস্তানা গাড়েন। বংশানুক্রমে তারা উপমহাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।
অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ) একাধারে প্রাবন্ধিক, দার্শনিক কোরআনে মুফাসিসর, কবি, ছড়াকার, ইতিহাসবেত্তাসহ বহু গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে ৩০ এপ্রিল মাগুরা জেলার ঐতিহাসিক পির ও জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক, বিটিভির নিয়মিত ইসলামিক অনুষ্ঠানের ভাষ্যকার, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আউলিয়াদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি পিরদের পির ছিলেন। তার কাছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দরবার ও খানকা শরিফের পির সাহেব ও খলিফারা এসে ইলমে তাসাউফের শিক্ষা গ্রহণ করতেন। তিনি তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন ধৈর্য সহকারে শুনে সেসবের উত্তর দিতেন। ভক্তরা তার জ্ঞানগর্ব দিক-নির্দেশনাসমূহ তন্ময় হয়ে শুনতেন। তার আব্বা হুজুর প্রখ্যাত অলিয়ে কামিল দ্বারিয়াপুর স্টেটের জমিদার হজরত শাহ সুফি তোয়াজ উদ্দীন (রহ) প্রতিষ্ঠিত ঢাকা সিদ্ধেশ্বরীর পির তোয়াজ উদ্দীন গার্ডেনের খানকা শরিফে প্রতি সপ্তাহের প্রথম বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক জিকিরের মাহফিল ও প্রতি ইংরেজি মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব মাসিক মাহফিল হতো। এই দুটো মাহফিলে তিনি নিয়মিত উপস্থিত থেকে মুরিদ মুতাকিদের তাহাজ্জুর ফয়েজ দিতেন। হুজুর পবিত্র কোরআন মজিদ ও সিয়াসিত্তার হাদিস গ্রন্থ থেকে ইলমে তাসাউফের ওপর দীর্ঘ আলোকপাত করতেন। সেসব মাহফিলে উপস্থিত থাকতেন দেশের ওলামায়ে মাশায়েখসহ বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কিছু খাস মুরিদান। লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকার কারণে অনেক সময় ভক্তদের সবার সাক্ষাত্ দেওয়া সম্ভব হতো না, কিন্তু কলমি জিহাদের মাধ্যমে তিনি সমাজসেবা ও তার কমিটমেন্ট সমাজের বিভিন্ন স্তরে পৌঁছে দিতেন। তিনি ২০০৬ সালে তার একমাত্র পুত্রসন্তান আলহাজ আরিফ বিল্লাহ মিঠুকে মদিনা মনোয়ারায় নিয়ে হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা মুবারকের সামনে দ্বারিয়াপুর শরিফের পির খিলাফতের পাগড়ি পরিয়ে দেন। সেই থেকে দেশের বিভিন্ন মাহফিলে মিঠু হুজুর দ্বারিয়াপুর শরিফের তালিম তালকিন পরিচালনা করে আসছেন।
অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম ১৯৬২ সালে ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ মাদ্রাসা থেকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ইংরেজি সাধারণ শিক্ষা লাভের জন্য কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ১৯৭০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়, উনসত্তুরের গণ-আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। জীবনের কৃতকর্মের জন্য জাতীয় লেখক পরিষদের নববর্ষ পুরস্কার ১৩৯৭, জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিষদের নজরুল স্বর্ণপদক ১৯৯৬, জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিষদের মওলানা ভাসানি স্বর্ণপদক ১৯৯১, আধ্যাত্মিক কবিতা পরিষদের সাহিত্য সম্মাননা ২০০০, মুসলিম সাহিত্য সমাজের শান্তি পদক ২০০৯ প্রাপ্ত হন। তিনি দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন, জনকল্যাণ ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তন্মধ্যে তামুদ্দুন মজলিস, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, বাংলাদেশ রুহানি দাওয়াত অন্যতম।
তার রচিত তিন হাজারের অধিক প্রবন্ধ এবং বহুসংখ্যক কবিতা ও ছড়া আছে। হুজুরের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে তাফসিরে তারাবি, অনুপম আদর্শ, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানি, খোকাখুকুর ছড়া, ফুরফুরার চাঁদ, জিহাদ কাদরিয়া তরিকা, সাব্বির কাব্যে, ইসলামী ভাবধারা, ইসলাম ও জীবন, প্রসঙ্গ ইসলামসহ অন্যান্য গ্রন্থ। ইসলামিক বিশ্বকোষে তার অনেক প্রবন্ধ রয়েছে। তার সম্পদনায় বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে বহু খণ্ডে সর্ব প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে বুখারি শরিফ প্রকাশিত হয়। তিনি খ্যাতনামা ইসলামিক পত্রিকা অগ্রপথিকেরও সম্পাদক ছিলেন। তিনি অনেকবার জলপথ ও আকাশপথে পবিত্র হজব্রত পালন করেন এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গমন করেন। লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। প্রেসিডেন্ট কাদরিয়া তরিকার বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতেন। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তার অধিকাংশ লেখাই এখনো গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়নি।
অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুমের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মূল দর্শন ছিল পবিত্র কোরআনুল করিম ও পবিত্র হাদিস শরিফের নির্যাস। তিনি তার রচিত প্রবন্ধ নিবন্ধ, কবিতা, ছড়া ও বিভিন্ন রচনায় কোরআন মজিদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বীজ বপন করে গেছেন। জীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলামের একজন দক্ষ সেনানি হিসেবে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে ইস্তেহাদ করেছেন। যেখানে সমাজ, সংসার, রাষ্ট্রনীতি, সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, পররাষ্ট্রনীতি, সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধসহ মানবজীবনের বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে। আবেগ আচ্ছাদিত হয়ে কোনো রচনাকে তিনি অযথাই অলংকৃত করেননি। সাবলিল ভাষায় রচিত তার লেখা ছিল সবার কাছে বোধগম্য। ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহের সঠিক দিকনির্দেশনার কারণে তার সমসাময়িক ইসলামিক চিন্তাবিদ ও লেখকদের মধ্যে তিনি অধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
বরণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ ও অলিয়ে কামিল অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওফাত গ্রহণ করেন। দ্বায়িয়াপুর শরিফে তার প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে তোয়াজিয়া এতিমখানা, দেশ-বিদেশে লাখ লাখ মুরিদান ও পাঠককূল তার স্মৃতি বহন করছে। হুজুরের স্মৃতি সংরক্ষণে তার ছেলে, ‘পির অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুম (রহ) ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করেছেন। আল্লাহ সুবহানতায়ালা হুজুরকে জান্নাতিদের একাংশের সরদার বানিয়ে দিন, তার প্রজ্ঞার আলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ুক অনন্ত প্রশান্তির জন্য।
lলেখক :খলিফা, নীলফামারী দরবার শরিফ
