সিলেটে ‘পুলিশি নির্যাতনে’ যুবকের মৃত্যু

অতিরিক্ত আঘাতে রায়হানের মৃত্যু :ফরেনসিক চিকিত্সক

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২০, ২২:৩৭

শরীরে অতিরিক্ত আঘাতের কারণেই রায়হান আহমদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম। গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। ডা. শামসুল বলেন, রায়হানের শরীরে অনেকগুলো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাকে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। এসব কারণেই তার মৃত্যু হতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাবে।

ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. শামসুল ইসলামকে প্রধান করে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন প্রভাষক ডা. দেবেস পোদ্দার, প্রভাষক ডা. আব্দুল্লাহ আল হেলাল।

এর আগে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্তের জন্য রায়হান আহমদের লাশ গতকাল বেলা ১১টার দিকে আখালিয়া নবাবী মসজিদ পঞ্চায়েত গোরস্থান থেকে উত্তোলন করে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। এ সময় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সজিব আহমদ ও মেজবাহ উদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্তের পর বিকালে একই স্থানে লাশ আবার দাফন করা হয়।

বিক্ষোভে উত্তাল সিলেট : সিলেটে বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ‘পুলিশি নির্যাতনে’ রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনার পঞ্চম দিনেও সিলেট ছিল উত্তাল। গতকাল বিকালে রায়হানের বাসার কাছে নেহারীপাড়ায় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে জনতা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। একই সময়ে সুবিদবাজারে ও দুপুরে আম্বরখানা পয়েন্টে ও শহিদ মিনারে সন্ধ্যায় কোর্ট পয়েন্টে পৃথক প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বক্তারা অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্রেফতার ও ফাঁসি দাবি করে বলেন, পুলিশ হেফাজতে কারো মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এর আগে দুপুরে নিহত রায়হানের মা সালমা বেগমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট লোকজন রেজিস্ট্রি মাঠ থেকে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলামের কাছে রায়হান হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবি করে স্মারকলিপি দিয়েছেন। এদিকে বিকালে পাঠানটুলায় রাস্তা অবরোধ করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে গেলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পুলিশকে ধাওয়া করে।

এসআই আকবরকে ধরতে ইমিগ্রেশনে পিবিআইয়ের চিঠি : কোতোয়ালি থানার বন্দর বাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ (সাময়িক বরখাস্ত) এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়াকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আকবর যাতে দেশ ত্যাগ না করতে পারে সেজন্য ইমিগ্রেশনে চিঠি দিয়েছে পিবিআই। সূত্র জানায়, রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত পিবিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এমন তথ্য জানান সংস্থাটির প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, ‘সিলেটের ঘটনার ডকেট (সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্যের নথি) আমরা গত পরশুদিন রাতে পেয়েছি। ঘটনাস্থলে সিলেটের পিবিআই টিম তিন থেকে চার ঘণ্টা ছিল। আমরা আমাদের তদন্ত শুরু করে দিয়েছি। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের মনে হয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এসআই আকবরকে আমাদের দরকার।’ তিনি বলেন, ‘এ কারণে সমগ্র ইমিগ্রেশনে আমরা জানিয়ে দিয়েছি আকবর যেন কোনোমতেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন ইমিগ্রেশন সেন্টারে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আকবর যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন। তাকে ধরার জন্য আমরা টিম রেডি করেছি।’

নিহত রায়হানের চাচা মো. হাবিবুল্লাহ দাবি করেন, রায়হানের পায়ের তলা ও হাঁটুর নিচসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। ফাঁড়ির ভেতর ‘পুলিশ নির্যাতন’ করে তাকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ তার। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি  কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে।

প্রত্যক্ষদর্শী এক অটোরিকশাচালকের বর্ণনা : নিহত যুবক রায়হানের সঙ্গে সেই রাতে কী ঘটেছিল তার বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী এক সিএনজি অটোরিকশাচালক। ঐ চালক ও তার আরেক সঙ্গীর দুটি সিএনজি অটোরিকশাতেই সেই রাতে বন্দর বাজার ফাঁড়ির দুটি পুলিশ টিম টহল দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই অটোচালক সংবাদমাধ্যমকে জানান, ১২ অক্টোবর দিবাগত রাতে নগরীর কাষ্টঘর এলাকার একটি সুইপার কক্ষ থেকে রায়হানকে বের করে নিয়ে আসে পুলিশ। সেখানে কোনো ছিনতাই বা রায়হানকে গণধোলাইয়ের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়নি। ঐ গলি থেকে রায়হানকে বের করে ঐ চালকের সঙ্গীর অটোরিকশায় ফাঁড়িতে নিয়ে আসে পুলিশ। এ সময় রায়হান পুলিশের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হন এবং বলেন, ‘আমি কোনো ছিনতাইকারী বা অপরাধী নই। রায়হানকে পুলিশ ফাঁড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পর দুই অটোচালক ফাঁড়ির বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে সকালে রায়হানকে গুরুতর অবস্থায় ঐ দুই চালকের একজনের অটোরিকশায় ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ।’