কৃষিতে নারীরা শস্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নতুন চাষাবাদ ও গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে কৃষিতে নারীদের তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রয়েছে
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব মতে, নারীরা যদি উত্পাদনের জন্য সম্পদ পুরুষের সমপরিমাণ পেত, তাহলে তারা তাদের ফার্মে ২০% থেকে ৩০% বেশি উত্পাদন করতে পারত
তিমির চক্রবর্তী
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে কৃষি যেটা দেশের জাতীয় জিডিপিতে ১৬% এরও বেশি অবদান রাখছে। বিবিএস ২০১৭ সালের তথ্যানুসারে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫% এর বেশি কৃষিখাতে জড়িত আছে এবং তাদের মধ্যে ৪১% হলো মহিলা।
কৃষি খাতের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো ফসলাদি, গৃহপালিত পশু-পাখি, মত্স্য এবং বনজ সম্পদ। কৃষি তথ্য সার্ভিস এর মতে, নারী শ্রম শক্তির মধ্যে ৬৮ শতাংশই কৃষি, বনায়ন ও মত্স্যখাতের সঙ্গে জড়িত। বলা চলে কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে নারী। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যানে নারীর এ উপস্থিতির কোনো স্বীকৃতি নেই।
বাংলাদেশের মহিলারা কখনো নিজের জমিতে কৃষক হিসাবে কাজ করে, পারিবারিক ফার্মে বিনা বেতনে কাজ করে এবং অন্যের জমিতে ও ফার্মে অর্থের বিনিময়ে অথবা বিনা বেতনে কাজ করে থাকে। কৃষিতে নারীরা শস্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে নতুন চাষাবাদ ও গৃহকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বে কৃষিতে নারীদের তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব মতে, নারীরা যদি উত্পাদনের জন্য সম্পদ পুরুষের সমপরিমাণ পেত, তাহলে তারা তাদের ফার্মে ২০% থেকে ৩০% বেশি উত্পাদন করতে পারত। এতে করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষি উত্পাদন আরো ৪% বৃদ্ধি পেত, যার ফলে ক্ষুধার্থ মানুষের সংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
বাংলাদেশ-এর জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ তে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের কাজের স্বীকৃতির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু আমাদের নারী কৃষি শ্রমিকেরা এখনো আইনগত স্বীকৃতি পায়নি। ফসল উত্পাদনের ২১টি ধাপের ১৭টিতেই নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ রয়েছে। এত কাজ করার পরও নারীর কাজকে কাজ হিসেবে গণ্য করা হয় না।
নারী কৃষকরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। জমি ও উত্পাদনশীল সম্পদে তাদের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নেই। নারী কৃষি শ্রমিকদের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া নিয়োগ দান করা হয়, তাদেরকে দীর্ঘ সময় কাজ করানো হয়, তারা মজুরী বৈষম্য ও অন্যান্য বঞ্চনার শিকার হয়।
কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের আয়ের টাকার ভাগও নারীকে দেওয়া হয় না। একারণে, জাতীয় আয়ে কৃষি খাতে নারীর অবদান বিবেচনায় আনা হয় না। কৃষিতে নারীর ভূমিকা শুধু ‘সাহায্যকারী’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, কৃষি উত্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী হিসাবে নয়।
যে সমস্ত নারীরা কৃষি সংক্রান্ত ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন তারা অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, যেমন জমি, কৃষি মার্কেট, উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, ইনপুট (বীজ, সার, ঋণ ও প্রশিক্ষণ) ইত্যাদি ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়ে থাকেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা পরিচালিত গবেষণা থেকে জানা যায় যে, সারা বিশ্বে কৃষিকাজে নিয়োজিত নারীরা উক্ত বিষয়ে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন, কারণ এই বিষয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ কম ও কম ব্যবহারের সুযোগ পান।
লিংগ বৈষম্য দূর করার মাধ্যমে যে বিশ্বব্যাপী শুধু খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধি ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে তা নয়, এই ধরনের পদক্ষেপ নারীদেরকে আর্থিকভাবে কার্যকর অন্যান্য কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিবে যার ফলে তারা অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ পাবে।
ইউএন উইমেন এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক মিশেল ব্যাচেলেট এর মতে, ‘যখন নারীর ক্ষমতায়ন হয়, জমি, নেতৃত্ব ও সুযোগ-সুবিধা পায় তখন অর্থনীতিতে গতি বাড়ে, খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায় এবং বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দেয়’।
ভারতীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক অর্থনীতির সমীক্ষায় জানা যায় যে, ‘কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্য কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় নারীর অবদানকে অবজ্ঞা করা যাবে না। কৃষিতে নারীর জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের নিশ্চয়তা দিতে হবে’।
অধিকার কর্মীদের মতে, দেশের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে কৃষিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে: সরকারি কৃষি কর্মকাণ্ডে, প্রান্তিক সুবিধাদি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। নারী কৃষি শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য তাদেরকে সহায়তা দেওয়া উচিত যাতে তারা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। কৃষি ব্যবস্থাপনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণকে উত্সাহ দেওয়া দরকার।
কৃষিতে নারীদের প্রয়োজনীয় সযোগ-সুবিধার (প্রশিক্ষণ, সেবা ও অন্যান্য সুবিধা) জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া এবং সেটা জাতীয় কৃষিনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। বাজার ব্যবস্থা মনিটরিং এ কৃষক প্রতিনিধি বিশেষ করে নারী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
কৃষিখাতে নারীরা যেসমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকেন সেসব বিষয় চিহ্নিত করা ও সেগুলো সমাধানের লক্ষ্যে উপায় খুঁজে বের করার জন্য গবেষণা কার্যক্রম হাতে নেওয়া দরকার। নারীর জন্য কৃষির সকল পর্যায়ে সহজে ও স্বল্প সুদে সরকারি ঋণ এর বিশেষ ব্যবস্থা এবং এই বিষয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উত্সাহিত ও মনিটরিং করা দরকার।
নারী কৃষক সংগঠন ও সংগঠক তৈরি ও দক্ষতা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া এবং নারী উপযোগী (বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারী) কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে আরো গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বর্গা চাষের নীতি কার্যকর ও আধুনিকায়ন করা, শস্য গুদাম এর ব্যবস্থা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন করা এবং শুধু মানসম্মত বীজ বাজারজাত করা উচিত যাতে কৃষকগণ প্রতারিত না হয়।
মজুরির ক্ষেত্রে লিংগ বৈষম্য দূর করা দরকার। খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং সম্পদ বিতরণের ক্ষেত্রে নারীদের জড়িত করা প্রয়োজন। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নারীদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। কৃষকদের সহায়তা করার জন্য যে সমস্ত সরকারি কার্যক্রম রয়েছে সেখানে নারী কৃষকদের জন্য কোটা থাকা প্রয়োজন এবং এই বিষয়টি জাতীয় কৃষি নীতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা দরকার।
ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষিবিষয়ক যে সমস্ত কমিটি রয়েছে সে সমস্ত কমিটিতে নারী কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন। এতে নারীরা কৃষিখাতে সরকারি সহায়তা কার্যক্রমের বিষয়ে অবহিত হতে পারবে ও উক্ত সেবা গ্রহণ করে উপকৃত হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত সার, বীজ, কিটনাশক ও কৃষি সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি এর জন্য ডিলারশিপ এর ক্ষেত্রে নারী কৃষকদের অগ্রাধিকারের বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে। সমস্ত মার্কেটে নারী কৃষকদের জন্য একটি বিশেষ কর্নার চিহ্নিত করে দেওয়া প্রয়োজন। নারীদের জন্য বাজার টোল এর বিষয়টি ছাড় দেওয়া যেতে পারে।
ছবি: ইন্টারনেট
