উদ্বেগের কারণ:শিশু ধর্ষণ

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:৪৫

অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শহরে বস্তি গড়ে উঠছে। বস্তি এলাকায় ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। আমরা শিশুর প্রতি কেমন আচরণ করবো

তা শিক্ষা পাই না। নারীর প্রতি আমাদের আচরণ কেমন হবে তাও জানি না। আবার পরিবারের প্রয়োজনে বাবা-মা দু’জনকে বাইরে থাকতে হচ্ছে সে সময়

ক্ষমতা না থাকার কারনে শিশুকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না বাবা-মা। আগে যখন মা-বাবা, দাদা-দাদি, সবাই একসাথে থাকতো তখন এমন ঘটনাও কম দেখা যেত। পাশাপাশি আমাদের সঠিক পারিবারিক শিক্ষার অভাব আছে। এমন সামাজিক অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্তিক কারনে সমাজের শিশু ধর্ষণ হচ্ছে।

এ বিষয় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার বিষয় জোর দেন

  রাবেয়া বেবী

 

মহানগরীর গেণ্ডারিয়ায় দীননাথ সেন রোডে ২ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। জানা যায় ৫ জানুয়ারি বিকেলে ২ বছরের শিশু আয়শা বাড়ির সামনে খেলার সময় প্রতিবেশি নাহিদ তাকে কোলে তুলে নিয়ে যায় এবং নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে শিশুকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করে।

সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর পুকুরে ফেলে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা সূত্রে জানা যায় যে, একই গ্রামের অম্বিকা রানী সরকারের কাছে প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রাইভেট পড়ত। ৬ জানুয়ারি নির্যাতনের শিকার শিশু প্রতিদিনের মতই প্রাইভেট পড়তে গেলে অম্বিকার ভাই জয়দেব সরকার শিশুটি জানায়, অম্বিকা বাড়িতে নেই। এই সুযোগে জয়দেব শিশুটিকে ধর্ষণ করে। শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে শিশুটিকে মৃত ভেবে জয়দেব বাড়ির পাশে পুকুরে ফেলে দেয়। পরবর্তীতে শিশুটির পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি করলে জয়দেব শিশুরটির লাশ পুকুর থেকে তুলে এনে তার বাড়ির বাথরুমে লুকিয়ে রাখে।

ঢাকা মহানগরীর ডেমরা থানাধীন শাহজালাল সড়কে ৫ বছর ও সাড়ে ৪ বছর দুই শিশুর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা সূত্রে জানা যায়, ৭ জানুয়ারি সকালে ঢাকার ডেমড়ার কোনাপাড়ায় বাসার সামনে খেলছিল দুই শিশু। হঠাত্ করেই তাদের খুঁজে না পাওয়ায় দুপুরের দিকে শিশুদের পরিবারের সদস্যরা এলাকায় মাইকিং করেন। পরবর্তীতে রাত ১০টার দিকে প্রতিবেশি কোনাপাড়ার শাহজালাল রোডের নাসিমা ভিলার নিচতলার ভাড়াটিয়া গোলাম মোস্তফার বাসার একটি কক্ষের খাটের নিচ থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৮ জানুয়ারি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে সাতক্ষীরায় আশাশুনি ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর পুকুরে ফেলে হত্যা, ঢাকা মহানগরীর ডেমরায় ৫ বছর ও সাড়ে ৪ বছর দুই শিশুকে হত্যা, ৯ জানুয়ারি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ রাজধানীর তুরাগ থানাধীন ভাবনারটেক এলাকায় খালার বাসা থেকে নিজ বাসায় ফেরার পথে ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রীকে প্রতিবেশী যুবক সবুজ রাস্তা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে।

৫ থেকে ৯ জানুয়ারি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ রাজধানী ঢাকায় এতগুলো শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। প্রতিদিন শিশু ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা নিয়ে আমাদের বছর শুরু হয়। গত কয়েক বছর পর্যবেক্ষণের ফলে দেখা যায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা যেমন বাড়ছে তেমন করে কমছে ধর্ষণের শিকার হওয়া শিশুর বয়স। দেশের বেশ কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার হিসাব মতে মোট ধর্ষণের ঘটনার প্রায় অর্ধেক শিশু। শিশুদের অর্ধেকের বয়স আবার ১২ বছরের নিচে। অনেকের বয়স ৬ বছরও পেরোয়নি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের মতে প্রতি মাসে গড়ে ৫৫টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশুরা দুর্বল, তাদের প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ ক্ষমতা কম বলে তারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বেশি। আবার তথ্যপ্রযুক্তি ও মাদক সেবন বাড়াছে শিশু ধর্ষণের ঝুঁকি। আইন বাস্তবায়নের উদাসিনতা, বিচারহিনতা, নানা রকম ছত্রছায়ার অপরাধী পার পেয়ে যাওয়া বা শাস্তি না হওয়া— বাড়িয়ে দিচ্ছে শিশু ধর্ষণ। এমত অবস্থায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে শিশু ধর্ষণ কমাতে এমনটাই মত দেন তারা।

সেভ দ্যা চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা কর্মসূচী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুটি কারনে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ। প্রথমত তরুণ বা যুব সমাজের বিকৃত যৌন চাহিতা বৃদ্ধি। এর দুটি কারন একটি তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিষয়গুলো অতি সহজে তার হাতে চলে আসা আর একটি মাদক সেবনের ফলে যৌন উদ্দিপনা বৃদ্ধি পাওয়া। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখানে বিবাহ বহির্ভুত শারীরিক সর্ম্পকের সুযোগ না থাকায় তাদের যৌন চাহিদা মেটাতে তারা শিশুদের ওপর পাশবিক আচরণ করছে। এই নির্যাতনগুলো দুর্বল, গরিব, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাথে ঘটছে না।

আমাদের সমাজে কোনভাবেই সুস্থ্য যৌন বিকাশের সুযোগ পাওয়া  যায় না। ফলে বিপদজনক আকার ধারন করছে বিষয়গুলো। আমরা প্রতিনিয়তই এমন ঘটনাগুলো দেখতে পাই। সরকারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে ঘটনা কমলেও প্রচার বেশি হয় এমন মন্তব্যের জবাবে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঘটনা প্রকাশ পায় বেশি এটা যেমন ঠিক, তেমন ঘটনা বেড়েছে এটাও ঠিক।

সমাজে কেন এমন অবক্ষয় দেখা যায় এমন প্রশ্নের জবাবে সমাজ বিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শহরে বস্তি গড়ে উঠছে। বস্তি এলাকায় ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। আমরা শিশুর প্রতি কেমন আচরণ করবো তা শিক্ষা পাই না। নারীর প্রতি আমাদের আচরণ কেমন হবে তাও জানি না। আবার পরিবারের প্রয়োজনে বাবা-মা দু’জনকে বাইরে থাকতে হচ্ছে সে সময় ক্ষমতা না থাকার কারনে শিশুকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না বাবা-মা। আগে যখন মা-বাবা, দাদা-দাদি, সবাই একসাথে থাকতো তখন এমন ঘটনাও কম দেখা যেত। পাশাপাশি আমাদের সঠিক পারিবারিক শিক্ষার অভাব আছে। এমন সামাজিক অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্তিক কারনে সমাজের শিশু ধর্ষণ হচ্ছে। এ বিষয় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার বিষয় জোর দেন এই সমাজ বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, আমাদের কারণগুলো চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা অপরাধিকে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একটি অপরাধের শাস্তি না হওয়া আর একটি অপরাধকে উত্সাহিত করে।