ইন্টারনেট আমাদের এখনকার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিক এই পৃথিবীর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা তথ্য ইন্টারনেটে সংরক্ষিত কিংবা লিপিবদ্ধ। পরিচয় থেকে শুরু করে ব্যাংক ব্যালেন্স, পথ চেনার গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম, শপিংয়ে গিয়ে কেনাকাটা, ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমে সহজে যেকোনো সেবা নেওয়া—সব কাজেই ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। আগুন আর চাকা আবিষ্কার করে যেভাবে দুই দফায় বিপ্লব ঘটেছিল, একইভাবে ইন্টারনেটও আরেক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু যুগান্তকরী বিভিন্ন আবিষ্কার যেমন ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে, তেমনি বারবারই সাক্ষী হতে হয়েছে নেতিবাচক নানা ঘটনার। যেমন ডিনামাইট আবিষ্কার হয়েছিল পাহাড় ভাঙতে, অথচ শেষপর্যন্ত তা ব্যবহার হয়েছে মানুষ মারার কাজে। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও এমনই কিছুটা ঘটেছে বৈকি!
চারদিকে তাকালেই ইন্টারনেটের অপব্যবহারের নানা খবর দেখতে ও জানতে পাই আমরা। ইন্টারনেটের বিভিন্ন অপরাধের মাধ্যম হতে পারে, সেটা হয়তো কিছুদিন আগেও কল্পনা মনে হতো। কিন্তু ইন্টারনেটের জগতে অপরাধের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো, তা মনোজগতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে।
এখনকার যুগে প্রতিদিনই মানুষ নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। সময় কাটাতে বা বিষণ্নতা এড়াতে অনেকেই উপায় হিসেবে বেছে নেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। কিছু একটা ঘটেছে, এ নিয়ে মনে ঝড় বইছে, ফেসবুকে দুই-চার লাইন লিখে ফেলা হলো, ব্যস! লাইক আর কমেন্ট পাওয়া গেল। চট করে কিছু ছবি আপলোড করে দিলেই হলো। লাভ রিয়েক্টের অভাব হলো না। অথবা কোনো ব্যাঙ্গাত্মক কিছু শেয়ার করার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন পাল্লা দিয়ে হা-হা রিয়েক্ট দিতে থাকল। কিন্তু এসব ঘটনার ফলে যা হয়, ওই স্ট্যাটাস বা পোস্টের লেখক বিষণ্নতা ভুলে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে থাকেন। অল্প কিছু কমেন্টে তৈরি হওয়া ‘জোরদার’ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার পর মনে হয়, আমার লেখায়ও তো অনেককিছু যায়-আসে। আমি যা বলছি তাও তো অন্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ বারবার অস্থির হয়ে লাইকের সংখ্যা গুনতে থাকেন। আবার পরবর্তীতে স্রেফ লাইক পাওয়ার জন্যই নতুন কিছু পোস্ট করতে উন্মুখ হয়ে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে তা কী কাজে দিচ্ছে?
সত্যিকার অর্থে, এই উন্মুখ হয়ে থাকার মধ্যেই রোপণ করা হয়ে যায় সর্বনাশের বীজ। কারণ, যে পোস্টে বেশকিছু লাইক পেয়ে কেউ একজন নিজেকে হঠাত্ করে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করলেন, সেই ‘লাইক’গুলো হয়তো তারা আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীদের অনেকে ভদ্রতার খাতিরে দিয়েছেন। কেউ কেউ সেই লেখাটা আদৌ পড়েছেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। আবার যিনি লাইক দিচ্ছেন, তার মধ্যেও নিজের বেলায় লাইক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হচ্ছে, অনেকটা ভদ্রতা বিনিময়ের মতো। ঠিক এই ক্ষেত্রেই মানুষ ঠিক-ভুলকে গুলিয়ে ফেলে। অনেকসময় কাছের কেউ কোনো লেখায় যুক্তি দিয়ে সমালোচনা করলে অহেতুক তার সঙ্গে তর্ক হচ্ছে, কিন্তু অপরিচিত বা স্রেফ ইন্টারনেটেই পরিচিত হওয়া কারোর অ্যাপ্রিসিয়েশনটাই দামি মনে হচ্ছে। ফলে ঝগড়া বা মনোমালিন্য তৈরি হচ্ছে সেই কাছের মানুষটার সঙ্গে।
এভাবে এমন এক মনোবাসনা তৈরি হয়, যে নিজে যা-ই বলবে অন্যরা নিশ্চয়ই তাতেই সমর্থন দেবে। এভাবে লাইক দিচ্ছি, কমেন্ট করছি, লাইক পাচ্ছি, কমেন্ট পাচ্ছির খেলা খেলতে গিয়ে আসল-নকল, ভুল-শুদ্ধর পার্থক্য ভুলে যাচ্ছে মানুষ। ঠিক-ভুলকে যাচাই করে বিশ্লেষণ করে যুক্তি দিয়ে ভাবার শক্তিও হারিয়ে ফেলছে।
আরও একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা হলো, অন্যের দেখাদেখি বা অন্যকে দেখানোর জন্য বিভিন্নসময় বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে চেক-ইন দেওয়া। যেমন রেস্টুরেন্টে গেছেন, চেক-ইন দিলেন। দামি খাবার খাচ্ছেন, ছবি তুলে আপলোড করে দিলেন। মেসেঞ্জারে মাই ডে-তে শপিং করে আনা রকমারি বর্ণিল পোশাক-পরিচ্ছদের ছবি দিয়ে বসলেন। এই কাজগুলো কেউ কেউ স্রেফ খেয়ালিপনার বশে করেন, কিন্তু অনেকের কাছেই এটা এমন যে, অন্যরা দেখুক আমি কী করছি! রীতিমতো অসুখের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে এই অভ্যাস।
আরেকটি অদ্ভুত বিষয় হলো ‘ট্রল’। সামনাসামনি দাঁড়ালে হয়তো কাউকে ব্যঙ্গ করে সহজে কিছু বলতে পারতেন না, এই কাজটাই অনলাইনে করলেন। একরকম আড়াল খুঁজে কাউকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ বা ‘বুলিং’ করা হলো। যাকে নিয়ে এমনটা করা হচ্ছে, এটা তার ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নারীদের হেয় করে বা হয়রানি করে অনেক অপরাধ তো হচ্ছেই, এতে আত্মহত্যার কথাও শোনা যায় প্রায়ই।
সবকথার শেষ কথা হলো, নেতিবাচক ঘটনা, অপ্রীতিকর ঘটনার ধরন, উপায় বা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে বসলে হয়তো আরও দুই-চারটা উপায় আবিষ্কার হয়ে পড়বে। কিন্তু বেছে নিতে হবে ইতিবাচক দিকগুলো। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্টের মোহ থেকে বের হয়ে এই মাধ্যমটিকে সুন্দরভাবে কাজে লাগিয়ে অনেক সৃষ্টিশীল কাজও করা যেতে পারে। অথবা এত জটিলতা বাদ দিয়ে নিছক একটা যোগাযোগমাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার করা হোক না, ক্ষতি কী!
