শিফারুল শেখ
যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বরের বক্তৃতায় বলেছিলেন, গণতন্ত্র বলতে ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার এবং জনগণের স্বার্থে পরিচালিত সরকারকে বোঝায়। যুক্তরাষ্ট্রকে উঁচু মাপের গণতান্ত্রিক দেশ বলেও মনে করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এই দেশে অর্ধেক নাগরিক ভোটই দেন না। জনগণের ভোট বেশি পেয়েও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না। কেবল দুটি দলই সরকারে আসে-যায়। অনেক সংখ্যালঘু নাগরিকের ভোটার আইডি কার্ডই নেই। তবে এবার ভিন্নচিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা নির্বাচনের দিন বজায় থাকলে চিত্র আলাদা হতে পারে।
g ভোটের হার কম কেন?
বেলজিয়ামে নির্বাচনে ৮৭ দশমিক ২ ভাগ, সুইডেনে ৮২ দশমিক ৬, ডেনমার্কে ৮০ দশমিক ৩, অস্ট্রেলিয়ায় ৭৯ এবং নরওয়েতে ৭৮ শতাংশ ভোট পড়ে। সেখানে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৭ ভাগ এবং ২০১৪ সালে ছিল ৩৬ দশমিক ৪ ভাগ। মার্কিন থিংক ট্যাংক দ্য স্যান্ডার্স ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, গত নির্বাচনে ভোট পড়ার হার হিসেবে রিপাবলিকান দলের ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং হিলারি ক্লিনটন প্রায় ২৭ শতাংশ করে ভোট পেয়েছিলেন। অর্থাত্ ট্রাম্প প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষের ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
গ্যালাপের জরিপ মতে, ৪৬ শতাংশ আমেরিকান নিজেদেরকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্তই করেন না। বাকিদের মধ্যে ২৫ শতাংশ রিপাবলিকান হিসেবে এবং ২৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দেন। ২ কোটি ১০ লাখ আমেরিকানের সরকারের ইস্যুকৃত ছবিযুক্ত ভোটার আইডি কার্ড নেই। মাত্র ১০টি রাজ্যে ভোটার আইডি কার্ড করা বাধ্যতামূলক। ২৫ শতাংশ আফ্রিকান আমেরিকানের ভোটার আইডি কার্ড নেই। যেখানে শ্বেতাঙ্গদের হার মাত্র ৮ ভাগ। কিছু রাজ্যে ভোটার আইডি কার্ডের আইন এমনভাবে করা যাতে এই বৈষম্য বাড়ছে। যেসব রাজ্যে আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক সেসব রাজ্যে সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার প্রয়োগের হারও বেশি।
নাইট ফাউন্ডেশন নামে অলাভজনক ও বামঘেঁষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভোটারদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নিয়মিত ভোট দেন না। সংখ্যার হিসেবে এর পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি। টাফ্টস ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং ফাউন্ডেশনের অন্যতম উপদেষ্টা আইটান হার্শের মতে, এই সংখ্যার মধ্যে সব রকম লোকই আছে। জনগণের এই বিচ্ছিন্নতার অর্থ হচ্ছে তারা নির্বাচন পদ্ধতির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত বলে মনে করছে না, এতে কিছু আসে যায় বলেও মনে করছে না।
বেলজিয়াম এবং চিলিতে ভোট প্রদান এক ধরনের বাধ্যতামূলক। এতে কাজও হয়েছে নাটকীয়ভাবে। অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিসহ কিছু দেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা অন্য উদ্যোগ নিয়ে ভোটার নিবন্ধন করে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা এবং ভোট দিতে যাওয়া অনেকটাই ব্যক্তিগত দায়িত্বের মতো।
গত কয়েক দশক ধরে অনেক রাজ্যই ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক নতুন সুবিধা দিচ্ছে। এর মধ্যে আছে এক দিনে ভোটার রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ, বেশি সময়ের জন্য ভোটকেন্দ্র খোলা রাখা এবং আগাম ভোট দেওয়া বা ডাকযোগে ভোট দেওয়ার মতো বিকল্প পথ সম্প্রসারিত করা। অধ্যাপক হার্শ বলেন, আমেরিকা যত বেশি জাতীয়তাবাদী এবং দলবাজ হয়ে উঠবে ততই হয়তো আরো বেশি মানুষ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যাবে।
g কতটা ন্যায়সঙ্গত ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি
জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নয়, ইলেক্টোরাল কলেজ নামে পরিচিত একদল কর্মকর্তার পরোক্ষ ভোটে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ‘কলেজ’ শব্দটি বলতে একদল লোককে বোঝায় যারা নির্বাচকের ভূমিকা পালন করেন। তাদের সবার কাজ প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন প্রার্থীরা সারা দেশে ভোটারদের কাছ থেকে যেসব ভোট পান সেগুলোকে বলা হয় পপুলার ভোট এবং ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটকে বলা হয় ইলেক্টোরাল ভোট। একটি রাজ্যে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পাবেন তিনি ঐ রাজ্যের সবগুলো ইলেক্টোরাল ভোট পেয়ে যাবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টেক্সাসে একজন প্রার্থী ৫০ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেলে ঐ রাজ্যের ৩৮টি ইলেক্টোরাল ভোটই তার পকেটে যাবে। ইলেক্টোরাল কলেজের মোট ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। মাইন ও নেব্রাস্কা বাদে বাকি সবগুলো রাজ্যের ইলেক্টোরাল ভোট যোগ দিলে যে প্রার্থী ২৭০টি বা তারও বেশি ভোট পাবেন তিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন।
২০১৬ সালে জনগণের ভোট বেশি পেয়েও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি হিলারি ক্লিনটন। তিনি ৬ কোটি ৫৮ লাখ ৫৩ হাজার ৫১৬ ভোট এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ৬ কোটি ২৯ লাখ ৮৪ হাজার ৮২৫ ভোট পেয়েছিলেন। ট্রাম্প ৩০৬টি ইলেক্টোরাল কলেজ পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচত হয়েছিলেন। হিলারি পেয়েছিলেন ২৩২টি ইলেক্টোরাল কলেজ। এর আগে ২০০০, ১৮৮৮, ১৮৭৬ এবং ১৮২৪ সালেও জনগণের ভোট কম পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। অনেক রাজ্যের ফলাফল আগে থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়। ফলে অনেকে ভোট দেওয়ার উত্সাহ হারিয়ে ফেলেন। যেমন-ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয় এবং নিউ ইয়র্ক ডেমোক্র্যাটের এবং টেক্সাস রিপাবলিকানের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ৫৪ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, ইলেক্টোরাল নয়, পপুলার ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে সংবিধানে সংশোধনী আনা উচিত। ঐতিহাসিক কারণে ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৮০৪ সালের পর ৫৩টি নির্বাচনে ৪৮ জনই নির্বাচিত হয়েছেন পপুলার ভোটে। এই পদ্ধতিতে ছোট রাজ্যগুলো গুরুত্ব পায়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের একটি মৌলিক নীতি-চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সও রক্ষিত হয়।
g এবার ভোটে আগ্রহ বাড়ছে!
যুক্তরাষ্ট্রে আগাম ভোটে আগ্রহ বেড়েছে প্রায় ৮৭ শতাংশ মানুষের। কেউ কেউ ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে অপেক্ষা করছেন। তরুণ বা যুবক ভোটাররা এবার বিপুলসংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে আসছেন। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাইকেল ম্যাকডোনাল্ড পরিচালিত ‘ইউএস ইলেকশন প্রজেক্ট’ এই তথ্য জানিয়েছে। ৩ নভেম্বর নির্বাচনে করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে ভিড় এড়াতে ভোটাররা আগেই মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন। শুক্রবার পর্যন্ত আগাম ভোট পড়েছে অন্তত ২ কোটি ২০ লাখ। ২০১৬ সালের নির্বাচনে এই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ লাখ।
গত মঙ্গলবার টেক্সাসে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে পোস্টাল ভোট নেওয়া হয়। ভোটের প্রথম দিনেই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ে রেকর্ড গড়ে। জর্জিয়ায় ১০ লাখের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছেন যা রেকর্ড। ওহাইওতে অন্তত ২৩ লাখ পোস্টাল ভোট পড়েছে যা ২০১৬ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে, আগাম ভোটে রিপাবলিকানদের তুলনায় দ্বিগুণ সংখ্যায় এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা। ডেমোক্র্যাট সমর্থক নারী ও কৃষ্ণাঙ্গরা অধিক হারে ভোট দিচ্ছেন। অনেকেই ট্রাম্পকে অপছন্দ করায় ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। অন্যরা এ বছর মিনেসোটায় কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবার ফ্লোরিডা, আইওয়া, পেনসিলভেনিয়া এবং নর্থ ক্যারলিনার ডেমোক্র্যাট ভোটাররা বেশি আগাম ভোটের আবেদন জানিয়েছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে আগ্রহ খুব কম। তবে ভোটের দিন যদি রিপাবলিকানরা কেন্দ্রে ব্যাপকভাবে উপস্থিত হন তাহলে ভিন্নচিত্র দেখা যেতে পারে। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিজের ২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মোট ভোট জালিয়াতির হার শতকরা শূন্য দশমিক ০০০০৪ ভাগ থেকে শূন্য দশমিক ০০০৯ ভাগ পর্যন্ত।
