নতুন বছরে আসন্ন সাত চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৪৬

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ২০১৯ সালে যে ঝুঁকিগুলো আছে বলে জানাচ্ছেন, সেগুলো আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ ইস্যুকে কেন্দ্র  করে মার্কিন ফেডারেল সরকারের আংশিক শাট ডাউন ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হয়। জানুয়ারির দুই সপ্তাহ কেটে গেলেও তা নিরসনের কোনো সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, এ বছর ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে তার ট্যাগ অব ওয়ার অব্যাহত থাকবে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সাল খুব সাড়া জাগানো একটি সময় ছিল না। বিদায়ী বছরটিতে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে মুখোমুখি বসেন, যা তার আগের বছর কেউ কল্পনাই করতে পারেনি। হয়তো এ বছরও দুই নেতার মধ্যে আবার মুখোমুখি সাক্ষাত্ ঘটবে। কোরিয়া উপদ্বীপকে ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু পরীক্ষা মুক্ত রাখার কৃতিত্ব ট্রাম্প দাবি করতেই পারেন। এটাও লক্ষণীয়, গত বছর তিনি ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত ছয় জাতি পরমাণু চুক্তি থেকে তার দেশকে বের করে নিয়েছেন। বেরিয়ে গেছেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও। অপরদিকে, চীন ও রাশিয়া পশ্চিমা বিশ্ব ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে নিজেদের মতো পথ করে নিয়েছে। বিদায়ী বছরের এসব ঘটনার দিকে তাকালে নতুন বছর নিয়েও একই রকম উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট সবগুলো পক্ষ শুভ বুদ্ধির পরিচয় দেবে। ২০১৯ সাল নিয়ে কিছু পূর্বানুমান—

১. ব্রেক্সিট পরবর্তী ইউরোপঃ ব্রেক্সিট বা ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি আগে যত সহজ ভাবা হয়েছিল বিষয়টি মোটেই সে রকম নির্ঝঞ্ঝাট হচ্ছে না। পদে পদে বাধার মুখে পড়ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। শেষ পর্যন্ত চুক্তিসহ, না চুক্তি ছাড়া এটি হবে তাও বলা যাচ্ছে না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পপুলিস্টদের উত্থান ঘটছে। তারা ইউরোপীয় অখণ্ডতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে ব্রেক্সিট হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। ব্রেক্সিট হওয়ার আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ছয়টি বিল পাস হতে হবে। অন্যথায় ২৯ মার্চের ডেটলাইন ঠিক থাকবে কি না বলা মুশকিল।

২. ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধঃ ট্রাম্প গত বছর চীনের বিরুদ্ধে যে শুল্ক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন সেটি এ বছর কোন দিকে মোড় নেবে তা নিশ্চিত নয়। যদিও এখন দুদেশের মধ্যে আলোচনা চলছে, সমঝোতার সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে। সেটি না হলে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অচল হয়ে পড়তে পারে। দাবি উঠতে পারে ডব্লিউটিও সংস্কারের।

৩. রবার্ট মুয়েলারের তদন্তঃ ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কথিত রুশ হস্তক্ষেপ নিয়ে তদন্ত করছে প্রধান মার্কিন কৌঁসুলি মুয়েলার। তদন্তে শেষে যদি দেখা যায় ট্রাম্পের প্রচার টিম আসলেই ক্রেমলিনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগযোগ বজায় রেখেছিল, তাহলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইমপিচ হতে পারেন। ডেমোক্র্যাটরা এখন কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ নিয়ন্ত্রণ করছে। সে রকম কিছু হলে দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেবে। রিপাবলিকানরাও দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে।

৪. কোরিয়া উপদ্বীপে অনিশ্চয়তাঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রথম মুখোমুখি বৈঠক গত বছর ১২ জুন সিঙ্গাপুরে হয়। ফেব্রুয়ারিতে তাদের মধ্যে আরেকটি বৈঠক হতে পারে। উন এখনো পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পথে পা বাড়াননি। তার কথা, আগে নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। চলতি বছর কোরিয়া উপদ্বীপ পরমাণু মুক্ত হবে কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ট্রাম্প যদি উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে চীনা ব্যাংকিং খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন তবে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

৫. অর্থনৈতিক স্থবিরতাঃ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাষ অনুযায়ী চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চাকা ধীরগতি হতে পারে। চীন-মার্কিন বাণিজ্য বিরোধ, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যে লড়াই দীর্ঘায়িত হওয়া এসব কারণে তা হতে পারে। ব্রেক্সিট ও ডানপন্থিদের উত্থানের ফল এবং টালমাটাল রাজনীতি ইউরোপের প্রবৃদ্ধি শ্লথ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

৬. অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যঃ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান লড়াইগুলো বন্ধ না                  হলে সংকট আরও জটিল হবে। সবচেয়ে পুরনো সমস্যা ফিলিস্তিন ইস্যুর  এখন কোনো সমাধান হয়নি। উল্টো যুক্তরাষ্ট্র জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করেছে। সৌদি আরব ও ইরানকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে গড়ে উঠতে পারে নতুন মেরুকরণ।

৭. অভিবাসী সংকটঃ চলতি বছর অভিবাসী সংকট গভীর হতে পারে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করেছে। মাদুরো ক্ষমতা থেকে সরে না দাঁড়ালে ভেনিজুয়েলার বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভবনা নেই। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ অভিমুখে বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকে অভিবাসী গমনের প্রবণতা এখনো বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে, ইউরোপে অভিবাসীবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।