মহাসড়কে বৈধ-অবৈধের দ্বন্দ্ব

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:০৮

দেশের ২২টি মহাসড়ক হইতে সাতদিনের মধ্যে ‘অবৈধ স্থাপনা’ উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়াছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। ইহা সত্য যে, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা চলিতেছে। তীব্র যানজট, দুর্ঘটনা ও ভাঙাচোরা সড়কে চলাচল আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে দিনকে দিন। এই পরিস্থিতির জন্য পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী সড়কের কোল ঘেঁষিয়া গড়িয়া ওঠা বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা। দেশজুড়িয়াই সড়ক-মহাসড়কের পাশে সরকারি জায়গা দখল করিয়া অবৈধ স্থাপনা, হাটবাজার, দোকানপাট, বিভিন্ন গাড়ির কাউন্টার, রেস্তোরাঁ, টার্মিনাল ইত্যাদি গড়িয়া তুলিতে দেখা যায়। বিশেষ বিশেষ দিনে অনেক সড়ক-মহাসড়কের উপর হাটবাজারও বসে।

সড়কের পাশে থাকিলে হাটবাজারে সুবিধা বেশি—তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন হইল—সড়ক মহাসড়কের সকল স্থাপনাই কি অবৈধ? ‘সড়ক ও জনপথের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০১৫’-তে বলা হইয়াছে যে, সড়ক ও জনপথের অব্যবহূত ভূমি উন্নয়নমূলক কাজের জন্য লিজ লইতে পারিবেন জনগণ। সরকারের নিকট হইতে নিয়মমাফিক নেওয়া লিজ নিশ্চয়ই অবৈধ নহে। অনেকেই এই ধরনের লিজ লইয়া সেইখানে বিনিয়োগ করিয়াছেন। তাহা হইলে এইখানে তাহাদের অপরাধ কোথায়? আসলে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা থাকিলে এই ধরনের হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়। ঢাকার সিংহভাগ ব্যস্ত রাস্তার সংযোগস্থল ও ফুটপাতে কেনাকাটার দৃশ্য চোখে পড়িবে। এই অবাধ হকারবৃত্তি সারা দেশেরই সাধারণ চিত্র। হকার থাকিবেই, সারা বিশ্বেই রহিয়াছে। ‘পজিশন’ বা ‘টং দোকানের’ জন্য অল্পবিস্তর চাঁদার বিনিময়ে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষ তাহাদের অন্ন সংস্থান করিয়া থাকেন এই হকারবৃত্তির মাধ্যমেই। পথচলতি মানুষও তুলনামূলক অল্পমূল্যে জিনিস খরিদ করিতে পারে এই সকল কথিত ‘অবৈধ’ দোকান হইতে। আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ন্যূনতম কিছু করিয়া খাইবার এই চেষ্টা একদিকে রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচকও। কারণ তাহারা কঠিন শ্রম দিয়াই নিজেদের অন্ন সংস্থান করিতেছেন। পথে পথে ঝামেলা, পদে পদে হয়রানির পরেও তাহারা আমাদের অর্থনীতির অনেকগুলি চাকার একটি।

সুতরাং সমস্যা বৈধ এবং অবৈধ—উভয় স্থাপনার ক্ষেত্রেই। কিন্তু ইহাও তো মিথ্যা নহে যে, সড়কের পাশে হাটবাজার-দোকানপাট অধিক থাকিলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। আবার হাটবাজার এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্তের হারও বেশি। এই সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন রহিয়াছে। মহাসড়কের কতখানি দূরত্বের মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা যাইবে না, সড়ক পরিবহন আইনেও তাহার স্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে। একই সঙ্গে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিলে পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর কী কী ব্যবস্থা লইতে পারিবেন, তাহারও উল্লেখ রহিয়াছে। তাহা হইলে সড়ক-মহাসড়কে অবৈধ স্থাপনা দিনের পর দিন জাঁকাইয়া বসিবার সুযোগ দেওয়া হয় কেন? দেখা যাইতেছে, অব্যবস্থাপনা ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করিবার দৃষ্টিভঙ্গিই যত সমস্যার মূলে। যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও হকারদের সুযোগ দেওয়া যায়। সারা বিশ্বেই ইহার উদাহরণ রহিয়াছে। সুতরাং একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাই পারে এই ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে।