২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভালোবাসা দিবসে’ আত্মহত্যা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তরুণ হোসেন। পরীক্ষায় বারবার অকৃতকার্য হওয়ায় হতাশাজনিত কারণে তিনি আত্মহত্যা করেন বলিয়া তাহার সহপাঠীরা জানান। পরের মাসেই আত্মহত্যা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সন্ধ্যাকালীন এমবিএ কোর্সের ছাত্র তানভীর রহমান। উদ্বেগের বিষয় হইল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৪ বছরে আত্মহত্যা করিয়াছেন ২৩ শিক্ষার্থী। তন্মধ্যে গত তিন বত্সরেই আত্মঘাতী হইয়াছেন ১১ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার এই প্রবণতা যে ক্রমবর্ধমান তাহার প্রমাণ হইল, ২০১৬ সালে যেখানে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র একজন, ২০১৮ সালে তাহা দাঁড়াইয়াছে সাতজনে। কেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার পথে পা বাড়াইতেছেন—তাহা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা অতীব জরুরি হইলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেন নাই বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। জানা যায়, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্র-নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তর’ নামে একটি দপ্তর থাকিলেও স্থায়ী কাউন্সেলর বা পরামর্শদাতা (মনোবিজ্ঞানী) রহিয়াছেন মাত্র একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে অধ্যয়নরত প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে ইহা অপ্রতুল বলিলে কমই বলা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু নহে, সার্বিকভাবে সারা দেশেই আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িতেছে বলিয়া সংশ্লিষ্ট মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন। তাহাদের মতে, বিশেষ করিয়া কিশোর-তরুণদের মধ্যেই ইহার মাত্রা অধিক। অবশ্য প্রতিদিনের সংবাদপত্রে চোখ বুলাইলেও ইহার সত্যতা সম্পর্কে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তুচ্ছ কারণেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটিতেছে। স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করে নাই এমন কিশোর-কিশোরীরাও রহিয়াছে এই তালিকায়। কেন এমনটি ঘটিতেছে তাহা লইয়া মনোবিজ্ঞানীদের নিজস্ব যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ রহিয়াছে—তাহা নিঃসন্দেহে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। সেখানে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রসঙ্গ যেমন গুরুত্বের সহিত উল্লিখিত হইয়াছে, তেমনি সমভাবে উঠিয়া আসিয়াছে মাদকের সর্বব্যাপী আগ্রাসনের বিষয়টিও। প্রসঙ্গত লক্ষণীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবার ও সহপাঠীরা জানাইয়াছেন যে মূলত বিষণ্নতা, শিক্ষাজীবন লইয়া হতাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং চাকরির অনিশ্চয়তার কারণে তাহারা আত্মহননের পথ বাছিয়া লইয়াছেন। একই সাথে শিক্ষার্থীদের ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রবলেম’-এর বিষয়টিও উপেক্ষণীয় নহে। বস্তুত বিষয়গুলি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং তাহা গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
সন্দেহ নাই যে, ইহা একটি সামগ্রিক সমস্যা এবং সামগ্রিকভাবেই তাহা মোকাবিলা করিতে হইবে। আর আত্মহত্যা যে প্রতিরোধযোগ্য তাহা লইয়াও দ্বিমত নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলিয়াছেন যে, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ হইতে সকল শিক্ষক, ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের লিখিতভাবে এই মর্মে অনুরোধ করা হইয়াছে যে, তাহারা যেন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্য ও জীবন সম্পর্কে অনুপ্রেরণামূলক কথাবার্তা বলেন। উদ্যোগটি যথার্থ ও প্রশংসনীয় বলিয়া আমরা মনে করি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এই ধরনের উদ্যোগ থাকা জরুরি। পাশাপাশি, জাতীয়ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত একটি কর্মকৌশলের আওতায় সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমও অব্যাহত রাখা উচিত।
