্বআর্থ-সামাজিক অগ্রগতি হয়েছে বিস্তর বাংলাদেশে। বিশেষ করে বিগত নয়-দশ বছরে। এই অভূতপূর্ব অর্জন আজ সারা বিশ্বে নন্দিত। নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত বাংলাদেশের আরও দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার জন্য ভিত ইতোমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে। এখন প্রয়োজন বিভিন্ন খাতের অগ্রগতিকে সুসংহত, সমন্বিত এবং ত্বরান্বিত করা।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ এই স্লোগান সম্বলিত ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে এই লক্ষ্যে সুচিন্তিত ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবসমূহ রাখা হয়েছে। এই নিবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
সার্বিকভাবে অর্থনীতিকে মধ্য আয়ের দেশে নিয়ে যাওয়া এবং বৈষম্য দূর করে একটি সুষম সমাজ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে যে অগ্রগতি হয়েছে তার ভিত্তিতে বাস্তবানুগ পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্ধারিত এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রস্তাবের দিকে নজর দেওয়া যাক।
প্রস্তাব করা হয়েছে, গ্রামে-গ্রামে শহরের সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত করা হবে। অর্থাত্ রাস্তাঘাট, টেলিযোগাযোগ, ব্যাংক, বীমা, ইন্টারনেটসহ শহরে প্রাপ্ত নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা পরিকল্পিতভাবে গ্রামে সম্প্রসারিত করা হবে। দ্রারিদ্র্য নিরসন করে টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে হলে এই আঙ্গিকে গ্রাম উন্নয়ন জরুরি। গ্রামীণ খাতসমূহে উত্পাদন বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ করে যুব সমাজের কর্মসংস্থান, এই প্রক্রিয়ায় সম্প্রসারিত করা সম্ভব। তবে গ্রামীণ খাতসমূহে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মূলত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত সুযোগ বৃদ্ধির জন্য। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ উত্সাহিত করতে হবে।
গ্রাম উন্নয়নের এই প্রস্তাবের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অন্য একটি প্রস্তাব হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন। এটি খুবই জরুরি, কেননা কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থায় গ্রাম পর্যায়ে, বিশেষ করে দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলসমূহে, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে মানবকেন্দ্রিক টেকসই গ্রাম উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্বায়ত্তশাসিত কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি জরুরি। এটি অবশ্য নতুন কথা নয়, আর ইতোমধ্যে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত দূরদর্শী বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ খুবই জরুরি। অন্যথায় অতিদারিদ্র্য নিরসনে এবং সার্বিক টেকসই গ্রাম উন্নয়নের গতি ব্যাহত হবে।
অপর একটি সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে যুব সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশে তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদেরকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উত্সাহিত ও সহায়তা করা হবে। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রামেও সৃষ্টি করা হবে। তবে বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণরা অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে যেমন শিল্প, বাণিজ্য, তথ্য প্রযুক্তি-ভিত্তিক কর্মকাণ্ড এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ অর্থনীতির সর্বত্র (শহর বা গ্রামে) যাতে কাজ পায় সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তরুণদের ভবিষ্যত্ যার সঙ্গে দেশের অগ্রগতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই এক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে, পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
তবে দেশের এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং সার্বিক আর্থ-সামাজিক বিকাশ উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে দেওয়া গেল। প্রথমত, দক্ষ জনবলের ব্যাপক অভাব রয়েছে প্রতিটি খাতে, বিভিন্ন পর্যায়ে। ইশতেহারে দক্ষ জনবল সৃষ্টির প্রস্তাব আছে। তবে ২০১১ সালে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা হলেও এখন পর্যন্ত এক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত রয়েছে। সুতরাং যেভাবে চলছে সেভাবে চললে সমস্যার সমাধান হবে না। খাতওয়ারী দক্ষতা এবং দক্ষতার পর্যায়ভিত্তিক প্রয়োজন নিরূপণ করে পরিকল্পিতভাবে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে প্রাপ্ত সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ বেরিয়ে যাচ্ছে। ইশতেহারে দুর্নীতি সম্পর্কে শূন্য সহনশীলতার নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এই ঘোষণা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রাপ্ত সম্পদ দিয়ে অনেক বেশি অর্জন সম্ভব। ব্যাংকিং খাতকেও দুর্নীতিমুক্ত করে স্থিতিশীলতায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেননা ব্যাংকিং খাত নানা উত্স থেকে সঞ্চয় আহরণ করে বিনিয়োগকারীদেরকে সরবরাহ করে। কাজেই ব্যাংকিং খাত সুস্থ না হলে অর্থনীতি রুগ্ন হওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে তাই শক্ত অবস্থানে থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। দুদককে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দুর্নীতিতে জড়িতদেরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নজরদারি বৃদ্ধি করে দুর্নীতির পরিসর সীমিত করার ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। লক্ষ্য অবশ্যই থাকবে দুর্নীতি নির্মূল। দুর্নীতি সম্বন্ধে শূন্য সহনশীলতার আঙ্গিকে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ক্রমশ খারাপের দিকে যাওয়া জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির সম্মুখে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর সব দেশই জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তবে যেসকল দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ সেগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশ সরকার সজাগ দৃষ্টি রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতসমূহ মোকাবিলায় সচেষ্ট হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিঘাতের ঝুঁকি হ্রাস অপরদিকে ঘটে যাওয়া অভিঘাতসমূহ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে বিশাল পরিমাণ অর্থ, নানা সবুজ লাগসই প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের বিভিন্ন দক্ষতাসম্পন্ন অনেক জনবল প্রয়োজন। কোনোটারই প্রয়োজনমতো সহসা প্রাপ্তি সম্ভব নয়। তবে যে সম্পদ-প্রযুক্তি-দক্ষতা হস্তগত হয় তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা যাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পাওয়া যায় তার জন্য প্রচলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে, জোরদার করতে হবে।
এক্ষেত্রে সমস্যা ও করণীয় সাধারণভাবে জানা আছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহের আঘাত হানার সময় ও এর অভিঘাতের ব্যাপকতা ও গভীরতা সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা খুবই বেশি। কাজেই সবসময় সতর্ক থাকতে হবে এবং সম্ভাব্য সকল প্রস্তুতি সময়মতো নিতে হবে। এ বিষয়ে যত তৈরি থাকা যাক না কেন, তুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে, গৃহীত কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে।
আরও একটি বিষয়ে পরিবর্তন দরকার। তা হচ্ছে-বাস্তবায়ন সংক্রান্ত। বাজেট বাস্তবায়নে প্রায় সারা বছর ধীরগতি এবং শেষ কয়েক মাসে তাড়াহুড়া করা হয়। ফলে পূর্ণ ও মানসম্পন্ন লক্ষ্য অর্জনে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। বছর বছর ধরে একই ধারায় তার বাস্তবায়ন চলছে। বিশেষ করে লক্ষণীয়, মেগা প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘসূত্রতা অনেক। এগুলো সময়মতো বাস্তবায়িত না হওয়ায় সুফল পেতে একদিকে দেরি হচ্ছে এবং অপর দিকে প্রকল্প বাস্তবায়ন খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। কারো গাফিলতির জন্য মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ঘাটতি হচ্ছে কিনা তা নিরূপণ করে দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত যাতে অন্যরা সে পথে না হাঁটে। একইভাবে ব্যাংকিং বা অন্যান্য খাতে যারা বড় বড় দুর্নীতির আশ্রয় নেয় তাদেরকেও দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি।
জাতির অগ্রযাত্রাকে জনভিত্তিক করে সকলের ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা যেতে পারে একটি অনুকূল নাগরিক-রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র সাংবিধানিক ব্যবস্থা, এবং সাংবিধানিক তাগিদ অনুসারে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার এই তিন মূল নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করে। এছাড়া, সংবিধানে সংযোজিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং প্রত্যেকের মানবাধিকার ও মানবমর্যাদা নিশ্চিত করা এবং সকলের কার্যকর অন্তর্ভুক্তি গণতন্ত্রের অকাট্য দাবি। এসকল ক্ষেত্রে ঘাটতিসমূহ দূর করে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা একটি বড় জয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের বড় দায়িত্ব। এই লক্ষ্যে জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বকীয়তায় ও বাইরের হস্তক্ষেপমুক্ত দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা জরুরি।
n লেখক :অর্থনীতিবিদ
