ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও বাস্তবমুখী শিক্ষা

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১০

একটি দেশের শিক্ষিত জনশক্তি সে দেশের মহামূল্যবান সম্পদ। অথচ আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তার ঠিক উল্টো। শিক্ষিত জনশক্তি দেশের বোঝা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। অনেকেই ভিটেমাটি ছেড়ে সুদূর বিদেশ বিভূঁইয়ে পাড়ি জমাচ্ছে। তারা সেসব দেশে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। অনেকে আবার তার যোগ্যতার চেয়ে নিম্নস্তরের কোনো চাকরি করে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। শিক্ষিত যুবকদের একটি বিরাট অংশ ঝুঁকে পড়ছে মাদক ব্যবসায়। তারা সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিণত হচ্ছে মাদকের আখড়ায়। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে।

কেন আমাদের শিক্ষিত যুব সমাজের এই অধপতন? কেন জনশক্তি আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে?

এসব প্রশ্নের একটিই সদুত্তর। আর সেটি হলো, ‘আমাদের অপরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা’। যখন একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ ১৮ বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশের বোঝা হিসেবে পরিগণিত হয় তখন অনুধাবন করা সহজ হয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা। যখন কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে দ্বারে দ্বারে চাকরির জন্য ধরনা দিতে দিতে ব্যর্থ হয়ে হতাশার অতলগহ্বরে তলিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তখন আমরা খুঁজে পাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে আমাদেরকে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তার নির্দিষ্ট বিভাগ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স কমপ্লিট করে চাকরির জন্য ভর্তি হতে হয় কোচিং সেন্টারগুলোতে। আরও দুই বছর কাটাতে হয় কোচিং সেন্টারের গদবাধা বুলি মুখস্থ করে। অতঃপর এই মুখস্থ বিদ্যা উগলিয়ে চাকরির জন্য যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে হয়। যার ফলে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, যে নাকি মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করার কথা ছিলো, সে হচ্ছে ব্যাংক কর্মকর্তা, শিক্ষা গবেষণার শিক্ষার্থী যার উচিত ছিলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা সে হয়ে যাচ্ছে পুলিশ অফিসার। কেমিস্ট্রির ছাত্র হচ্ছে ফরেন ক্যাডার। যার ফলে এসব সেক্টরগুলোতে এমন লোকজন নিযুক্ত হচ্ছে যাদের কোনো প্রাথমিক জ্ঞান নেই এসব বিষয় সম্পর্কে।

এসব পোস্টে আবার আসন সংখ্যা নিতান্ত সীমিত। আমরা দেখতে পাই প্রতিবছর বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ২০০০ পদের জন্য চার লক্ষ শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে বেকারত্বের দিকে ধাবিত করছে। ‘বাংলাদেশ শিক্ষানীতি ২০১০’ যেখানে শিক্ষার সংজ্ঞায়নে বলা হয়েছে  ব্যক্তি তার ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান রাখবে। অথচ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন দূরে থাক সে ব্যক্তিজীবনে পরনির্ভরশীল হয়ে টিকে থাকতে হচ্ছে।

আমরা যদি ‘শিক্ষা আইন ২০১৬’-এর দিকে লক্ষ্য করি যেখানে নোটবই, গাইড, কোচিং বাণিজ্য ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গাইড বইয়ের ছড়াছড়ি। সারাদেশে কোচিং ব্যবসায়ীদের হচ্ছে রমরমা বাণিজ্য। ‘শিক্ষানীতি ২০১০-এ ৫ম শ্রেণি ও ৮ম শ্রেণিতে সমাপনী পরীক্ষার উল্লেখ নেই অথচ কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে শুধুমাত্র কোচিং বাণিজ্য ও নোটবই এবং গাইডবই বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে অমানুষিক খাটুনি খাটতে বাধ্য করানো হচ্ছে। অভিভাবকরা জিপিএ-৫ পাওয়ানোর জন্য তোতাপাখির মতো প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করাচ্ছেন। ধ্বংস করছেন শিশুর সম্ভাবনাময় প্রতিভাকে। কোচিং, হোমওয়ার্ক, টিউটর ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্বিষহ করে তুলছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে। যার ফলে গড়ে উঠছে সৃজনশীলতা বিহীন একশ্রেণির শিক্ষিত সমাজ।

আমরা যদি বিশ্বের ২য় অর্থনৈতিক শক্তিশালী রাষ্ট্র চীনের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। প্রতিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে রয়েছে ব্যবহারিকভাবে জ্ঞানার্জনের জন্য সামগ্রিক উপকরণ। এ বছর চীনের সিনইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন গাড়ি আবিষ্কার করে রেকর্ড তৈরি করেছে। অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অকর্মা সার্টিফিকেটধারী তৈরি করা হচ্ছে। যারা শুধু রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের ফেসবুক পোস্টে গুছিয়ে তোষামোদি করা ছাড়া আর কিছু করতে জানে না। আমরা যদি জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব তারা কর্মমুখী শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা তাদের বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় করছে শিক্ষাব্যস্থাকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে।

জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সংকল্প করেছিলেন অথচ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও আজ বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন করা হয়নি। আমরা এখনো ২.১ শতাংশের ওপরে যেতে পারিনি। আমরা এখনো পারিনি তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহারিক জ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে। এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা।

শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হলে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে কর্মমুখী শিক্ষার উপর। এক্ষেত্রে আমরা চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ইত্যাদি দেশগুলোকে আইডল হিসেবে ধরে নিতে পারি। সর্বোপরি শিক্ষাখাতে বাজেটের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। উচ্চশিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাবাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে হবে। তবেই সম্ভব হবে আমাদের দৈন্যদশা থেকে উত্তরণ। বেকার সমস্যা হবে দূরীভূত। দেশ হবে সমৃদ্ধ। পরিপূর্ণ হবে  ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা।

n লেখক:শিক্ষার্থী, বাদেদওরাইল ফুলতলী  কামিল (এমএ) মাদরাসা