মমতার তাজ মমতাজ

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২০, ২০:৩৯

রকিব হোসেন

 

করোনাকাল এখনো চলছে। তবে দেশে সেই লকডাউন নেই। মানিকগঞ্জের ভাকুম গ্রামের মধুর মঞ্চে গানের আসর জমেছিল গত শুক্রবার। এর পাশেই রয়েছে মমতাজের বাবা মধু বয়াতির সমাধি। তার স্মরণেই গড়ে ওঠেছে মধুর মঞ্চ। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি সেখানে গান করেছিলেন তাদের বাউলমাতা মমতাজও। গান শেষে মধ্যরাতে কথা হয় তার সঙ্গে। মমতাজ এই আয়োজনের কারণ উল্লেখ করে মমতামাখা কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা কঠিন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ছয়-সাত মাস ধরে আমাদের শিল্পীদের বেশ খারাপ সময় যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে স্টেজ শো বন্ধ রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই সময়ের মধ্যে দু’একটি টিভি লাইভ শো ছাড়া তেমন কোনো অনুষ্ঠানে গাইনি। কিন্তু আমাদের  গ্রাম-গঞ্জের শিল্পীরা একেবারে ঘরে বসে বেকার সময় কাটাচ্ছেন। এখানে বিখ্যাত নন এমন অনেক শিল্পী আছেন, নিদারুণ কষ্টের মধ্যে রয়েছেন তারা। মধুর মঞ্চের আজকের আয়োজনটি করা হয়েছে তাদের উজ্জীবিত করার জন্য। গান করে অনেকেই আজ শ্রোতাদের কাছ থেকে আর্থিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। এই দুঃসময়ে তারা যা-ই পেয়েছেন, এতে করে কিছুটা হলেও তাদের কষ্ট লাগব হবে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল এটাই। আর যেহেতু এটা বাউল মঞ্চ, এখানে প্রতি মাসে একটা করে অনুষ্ঠান করতে চাই। স্থানীয় বাউল শিল্পীদের জন্য আয়োজনটা কন্টিনিউ করার ইচ্ছে আছে। কারণ শিল্পীরা না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে হাত পাততে পারেন না। তাদের আত্ম-সম্মানবোধ অনেক বেশি।’ মমতাজ করোনাকালে লকডাউনের পুরোটা সময়ই নিজের নির্বাচনী এলাকায়ই (মানিকগঞ্জ-২) কাটিয়েছেন। এসময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন এই সাংসদ। সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মাটির গানের শিল্পী বললেন, ‘আমি করোনার প্রথম তিন মাস নিজের গ্রামের বাড়িতেই ছিলাম। এর কারণ আমি যেহেতু রাজনীতি করি, এই সংকটময় সময়ে আমি আমার এলাকার মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছি। নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগের বাইরে সরকার ও সমাজের বিত্তশালী মানুষের সহায়তায় আমি বিভিন্ন জায়গার ঘুরে ঘুরে ত্রাণ দিয়েছি সংকটে থাকা মানুষদের। করোনার পাশাপাশি সেই সময়টায় বন্যাও ছিল। আর বন্যায় আমাদের পদ্মাপাড়ের এলাকা ডুবে যায়। হরিরামপুর ও উপজেলা সদরের প্লাবিত এলাকাগুলোর দিকে আমার দারুণ নজর ছিল। আমি মানুষের জন্য নিজেকে সদা প্রস্তুত রেখেছিলাম। চেষ্টা করেছি তাদের জন্য কিছু করতে। ত্রাণের পাশাপাশি আমি কঠোর লকডাউনের মাঝেও একা একা স্টুডিওতে গিয়ে কারোনাকালীন সচেতনতার ওপর গান করেছি। একদিকে যেমন আমি গানের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষকে সচেতন করেছি, এর বাইরে আবার ত্রাণ নিয়ে এলাকার মানুষের পাশে থেকেছি। এছাড়া আমি আমার পরিবারকেও সময় দিয়েছি। বাচ্চাদের নিয়ে মধু মঞ্চের মাঠে ক্রিকেট খেলেছি। করোনার ভয় তাদের মনে ঢুকতে দেইনি।’ ফোক সম্রাজ্ঞী মমতাজ এখন একজন সফল রাজনীতিকও। কোন জনপ্রিয়তাটা বেশি উপভোগ করেন?—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে জনপ্রিয়তা নিয়ে আলাদা করে ভাবিনি। আমি একজন শিল্পী, আমাকে মানুষ ভালোবাসে। পাশাপাশি একজন রাজনীতিক হয়েছি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে, তাদের জন্য কাজ করতে এসেছি। এটা একটা আরেকটার পরিপূরক। আমি যখন গান করি, গানের জগতে আমি মানুষের জন্য কাজ করছি, তারা আমাকে ভালোবাসে। পাশাপাশি সেই ভালোবাসা থেকেই আবার রাজনীতির মাঠে এসেছি জনসেবা করব বলে। সেখানেও আমি তাদের পাশে পেয়েছি একইরকম করে। আমার শিল্পী সত্ত্বা, রাজনীতিক সত্ত্বা ও ব্যক্তি সত্ত্বা একই। সবগুলো কাজের সাফল্যই আমি সমানভাবে উপভোগ করি। তবে যদি বলা হয় আমি কোন পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, তাহলে অবশ্যই নিজের শিল্পী পরিচয়টাকেই বড় করে দেখব। কারণ আমার যা কিছু অর্জন, সেগুলোর মূলে রয়েছে শিল্পী মমতাজ।’