ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসিএইচ) চালু হয়েছে ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টার (ওএসইসি)। এখানে রয়েছে ৪টি আইসিইউ বেড, ৬টি এইচডিইউ বেড ও ৫টি অবজারভেশন বেড। এছাড়া রয়েছে জরুরি রোগীদের ইসিজি, নেবুলাইজেশন, এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফি, সিটিস্ক্যান এবং রক্তের জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা। সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সাজানো হলো পূর্ণাঙ্গ জরুরি বিভাগ। সংকটাপন্ন রোগীরা এক জায়গায়ই পাচ্ছেন আধুনিক সকল চিকিত্সা সুবিধা। এতে রোগীদের মৃত্যু ঝুঁকি কমেছে, ৭০ ভাগ হয়রানির অবসান ঘটেছে। এক ছাতার নিচে জরুরি সব স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ায় রোগী ও তাদের স্বজনরা সন্তুষ্ট। উন্নত বিশ্বেও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এই ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টার প্রশংসিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, সময়ের প্রয়োজনে খুবই উপযোগী ও চমত্কার উদ্যোগ এটি। তবে ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারের রক্ষাণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক ভালো উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে যেন সেটি না ঘটে।
সরজমিনে দেখা যায়, ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টার ১৫ শয্যার একটি আধুনিক ও জীবন রক্ষাকারী চিকিত্সা ব্যবস্থা। বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনাসহ আহত রোগীদের ক্যাজুয়ালটি চিকিত্সার জন্য ৫ শয্যাবিশিষ্ট একটি ক্যাজুয়ালটি অবজারবেশন কক্ষ রয়েছে। যেখানে ইসিজি, নেবুলাইজেশন, কার্ডিয়াক মনিটরসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। গাইনি অ্যান্ড অবস ও শিশু রোগীদের কনসালটেশন কক্ষ নতুনভাবে করা হয়েছে। নিউরোসার্জারি ও হেড ইনজুরিসহ বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল রোগীদের জন্য একটি জেনারেল সার্জারি ও নিউরোসার্জারি জরুরি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এখানে ৩ শয্যার একটি মাইনর ওটি রয়েছে। রাসায়নিক দূষণজনিত রোগীদের জরুরি চিকিত্সার জন্য একটি ডিকন্টামিনেশন কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে আগত রোগীদের দ্রুত রোগ নিরূপনের জন্য এই কমপ্লেক্সে ১২৮ স্লাইস সিটি স্ক্যান মেশিন নতুনভাবে স্থাপন করা হয়েছে। ডিজিটাল এক্সরে, আল্টাসনোগ্রাফিসহ একটি মিনি প্যাথলজি ল্যাবরেটরি নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে যেকোনো মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত রোগ নিরূপন করে চিকিত্সা দেয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিত্সকরা ২৪ ঘণ্টা চিকিত্সা দিচ্ছেন। আগে অনেক সংকটাপন্ন রোগী জরুরি বিভাগে পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সাসেবা না পেয়ে দুর্ভোগে পড়তেন। প্যাথলজির জন্য এক জায়গায়, সিটি স্ক্যানের জন্য আরেক জায়গায়-এভাবে ট্রলিতে যেতে যেতেই অনেক রোগীর মৃত্যু হতো। এখন আর সেই দুর্ভোগে তাদের পড়তে হচ্ছে না।
ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারের আওতায় অত্যাধুনিক আইসিইউ রাখা হয়েছে। কোন রোগী আইসিইউতে চিকিত্সা নিয়ে একটু সুস্থ হলে তাকে এইচডিইউ’তে রাখা হবে। রোগী আরো সুস্থ হলে এইচডিইউ থেকে অবজারভেশন বেডে স্থানান্তর করা হচ্ছে। অবজারভেশন বেড আছে ৫টি। প্রতিটি বেডই অত্যাধুনিক। সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের বসার চেয়ার। কোথাও কোনো ময়লা আবর্জনা নেই। আগত রোগীদের প্রথমে ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার (ইএমও) রিসিভ করছেন। ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে অর্থোপেডিক্স, নিউরোলজি ও নিউরো সার্জারি, হূদরোগ, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ এবং শিশু রোগ বিশেষজ্ঞরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রত্যেক বিভাগে একজন করে কনসালট্যান্ট নিয়োজিত। তাদের তত্ত্ববাবধানে সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত চিকিত্সক, নার্স, ওয়ার্ড বয়, ওটি বয় ও অন্যান্য লোকবল নিয়োজিত আছেন।
রোগীদের টিকিট সংগ্রহের জন্য টিকিট কাউন্টার, অপেক্ষা করার স্থান ও তথ্য কেন্দ্র করা হয়েছে। ট্রলি ও হুইল চেয়ার রাখার স্থান এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নজরদারি করার জন্য আলাদা কাউন্টার করা হয়েছে। জরুরি বিভাগের সকল কর্মকান্ড তদারকি করছেন একজন সহকারী পরিচালক ও একজন ডেপুটি মেট্রোন। বিভিন্ন সময় হাসপাতালের কনসালটেন্টদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চিকিত্সকদের নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে জরুরি বিভাগ ও ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এই ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টার উদ্বোধন করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন জানান, সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রেফারেন্সসহ জরুরি মুমূর্ষু রোগী আসেন। জরুরি রোগীর চিকিত্সার জন্য যা যা প্রয়োজন তা এক জায়গাতেই এখানে রয়েছে। তিনি বলেন, ঢামেকের জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ১২০০-১৫০০ রোগী আসে। এই বিপুলসংখ্যক রোগী ২ জন ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ও ৪ জন ক্যাজুয়ালটি চিকিত্সকের পক্ষে যথাযথভাবে চিকিত্সা দেওয়া অত্যন্ত জটিল ও কষ্টসাধ্য ছিল। এ পরিস্থিতিতে জরুরি বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও চিকিত্সা সুবিধাদি বৃদ্ধি করা হলো। এখানে সব ধরনের রোগীর জীবন রক্ষাকারী সুবিধাদি রাখা হয়েছে। জনবল সংকটের বিষয়ে একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, আপাতত ডাক্তার ও নার্স সংকট হবে না। তবে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সংকট রয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
