যেসব জাতি সাহিত্যের কাছে ঋণ স্বীকারে অকুণ্ঠ, তারা নিঃসন্দেহে উন্নত জাতি।— এমন একটা বাক্য আমরা সিদ্ধান্ত আকারে হাজির করতেই পারি; তা যতই থাকুক ভাষা ও সাহিত্যের রাজনীতি, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের কূটনীতি। কিন্তু যখন ইংরেজরা স্বয়ং শেক্সপিয়রকে নিয়ে, জার্মানরা গ্যেটেকে কিংবা রুশরা পুশকিন-তলস্তয়কে নিয়ে উল্লাস-আদিখ্যেতা করে, সেখানে জাতিগতভাবে তাদের মননের মধুর ভাগটাই বেশি মনে হয়। অন্যদিকে এই চার মহারথীর তুলনায় রবীন্দ্রনাথ ব্যাপক-বিপুল-বিচিত্র হওয়া সত্ত্বেও আমরা কোথায় যেন কুণ্ঠ, তাঁকে ঘিরে আমাদের অনেক ‘কিন্তু’ কাজ করে। ভাগ্যিস ঠাকুর হাজার-দুই গান লিখেছিলেন, অন্তত সেই কারণে হলেও আমরা জনসাধারণ তাঁকে কিছু কল্কে দিই। কারণ আমাদের আত্মার কথা এমনভাবে তাঁর গানে গাঁথা, তাঁকে প্রতিদিন স্মরণ না করে উপায় নেই। আর আমরা যেহেতু আত্মিক-আর্থিকভাবে ‘খেলাপি’ জাতি, তাই ‘ঋণ’ স্বীকার বড়ো বালাই! বন্ধনীতে বলে রাখি, কথাগুলি কইছি জাতীয় মানসিকতার জায়গা থেকে; যত্সামান্য বিশেষজ্ঞ-পণ্ডিত-গবেষক বা গুণী পাঠককে গোনা থেকে বাদ দিয়ে রাখছি।
তবে ঠাকুরের গান যদি আত্মিক প্রশ্নে আমাদের ঋণী করে, তবে জীবনানন্দের কবিতার কাছেও আমরা সেইভাবে ঋণী। মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি রবীন্দ্রনাথের গান আর জীবনানন্দের কবিতা না থাকত, আমাদের মন-মননের দশা কী হতো, কোথায় পেতাম আমরা আত্মিক আশ্রয়! বিশেষ করে, আজকের যে বৈশ্বিক-রাষ্ট্রিক বাস্তবতায় আমরা বাস করি, সেখানে প্রতি-প্রতিদিনের জীবনের যে দায় ও দাবি, ক্ষয় ও ক্ষরণ, ক্ষত ও রক্তাক্ততা, অন্তহীন ক্ষুিপপাসা-বাসনাবিষ, শারীরিক-মানসিক ব্যাধি ও বিকার, আত্মিক রুগ্ণতা আর ক্ষমাহীন নির্দয়তা—এর জাতীয় মানসিক শুশ্রূষা এত গহন-গভীরভাবে কোথায় পেতাম?
২.
এ কথা নিশ্চয়ই তত্ত্ব করে বলার দরকার নেই, ঠাকুরের গান আর জীবনানন্দের কবিতার যাবতীয় ক্ষেত্র আলাদা। কিংবা বোধবিষয়চিন্তনে এদের প্রভাব ও পরিসর সম্পূর্ণই বিপরীত। কিন্তু আমাদের মনোজগতে এই উভয়ের ক্রিয়া ও প্রভাব কী এক আশ্চর্য রসায়নে জাদু-উপশমের কাজ করে। আমরা জীবনের বিচিত্রজটিল মনো-শারীরিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে গিয়ে কিংবা বহুস্তরিক-বাস্তবতার মোকাবিলা করতে গিয়ে কীভাবে যেন উভয়ের কাছেই ফিরে ফিরে যাই। বোধ করি, এজন্যই, আমাদের প্রত্যেকের যেমন একজন পৃথক ও অন্তর্গত রবীন্দ্রনাথ আছেন, তেমনি আছেন ব্যক্তিগত জীবনানন্দও, যাঁরা বিভিন্ন আনন্দ-বেদনা-যাতনামুহূর্তে আমাদের ভিতর থেকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন।
তাই ঠাকুর যখন গানে বলেন : ‘হূদয় আমার প্রকাশ হল অনন্ত আকাশে।/বেদন-বাঁশি উঠল বেজে বাতাসে বাতাসে’
আবার যখন জীবনানন্দ কবিতায় বলেন : ‘একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে- একবার বেদনার পানে/অনেক কবিতা লিখে চ’লে গেলো যুবকের দল;/পৃথিবীর পথে-পথে সুন্দরীরা মূর্খ সসম্মানে/ শুনিল আধেক কথা;- এই সব বধির নিশ্চল/সোনার পিত্তলমূর্তি: তবু, আহা, ইহাদেরি কানে/অনেক ঐশ্বর্য ঢেলে চ’লে গেলো যুবকের দল;/একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে- একবার বেদনার পানে।’— তখন আমাদের মানসব্রহ্মাণ্ডের কাল-মহাকালের নানা তল ও মাত্রা একইসঙ্গে ধরা দেয়।
আবার ঠাকুর যখন : ‘এমনি ক’রেই যায় যদি দিন যাক না।/মন উড়েছে উড়ুক না রে মেলে দিয়ে গানের পাখ্না/...মাথার ’পরে খুলে গেছে আকাশের ওই সুনীল ঢাক্না’
আর জীবনবাবু : মাথার ভিতরে/স্বপ্ন নয়— প্রেম নয়— কোনো এক বোধ কাজ করে।...বলি আমি এই হূদয়েরে:/সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!’—আমরাও কি তখন একই সঙ্গে বোধের জগত্-মহাজগত্ নিজের ভিতরে আবিষ্কার করি না!
এই সাংগীতিক ও কাব্যিক নৈকট্য-দূরত্বর বাইরে, যদি রবীন্দ্রনাথের ‘সভ্যতার সংকট’ আর জীবনানন্দের ‘সুচেতনা’ কবিতাকে পাশাপাশি পাঠ করি, তাহলে এই ভঙ্গুর-নিঠুর সময়েও তাঁদের কাছ থেকে অন্তর্গত-শুশ্রূষা অনুভব করি। রবীন্দ্রনাথ এই গোঁ-ধরা জাতির মধ্যে সেই বিরল বাঙালি, যিনি সত্যের প্রশ্নে বারবার নিজেকে অস্বীকার করেছেন, নিজের ভুল স্বীকারে ছিলেন নির্দ্বিধ। এ কারণে জনমত-জাতিমত তো বটেই, নিজের বিরুদ্ধে গিয়েও বহু কঠিন সত্য উচ্চারণ করেছেন। যদিও পণ্ডিতেরা তাঁর ‘জীবনদেবতা’ নিয়ে যত আলোড়ন তুলেছেন, সে তুলনায় তাঁর ‘সত্যদেবতা’র প্রতি তেমন আলো ফেলেননি। তো, তাঁর ৮০ জন্মবর্ষপূর্তিতে ‘সভ্যতার সংকট’ নামের অভিভাষণে সত্যের চূড়ান্ত পূজা করেছেন ঠাকুর। কিছু টুকরো তুলে দিচ্ছি : ‘জীবনের প্রথম-আরম্ভে সমস্ত মন থেকে বিশ্বাস করেছিলুম য়ুরোপের সম্পদ অন্তরের এই সভ্যতার দানকে। আর আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল।’ কারণ তিনি দেখলেন : ‘সমস্ত য়ুরোপে বর্বরতা কী রকম নখদন্ত বিকাশ করে বিভীষিকা বিস্তার করতে উদ্যত। এই মানবপীড়নের মহামারী পাশ্চাত্য সভ্যতার মজ্জার ভিতর থেকে জাগ্রত হয়ে উঠে আজ মানবাত্মার অপমানে দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত বাতাস কলুষিত করে দিয়েছে।’ কারণ ‘সভ্যতার বর্বরতা’র নমুনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি দেখেছেন। তারপরও ভরসা হারাননি। তাই বলছেন : ‘...মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।... মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি।’
আর জীবনানন্দ এই বিশ্বযুদ্ধ কেবল কি দেখেছেন, বরং তাঁর জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে এর সামূহিক প্রভাব, যার শিকার সৌভাগ্যবশত ঠাকুরকে হতে হয়নি। অথচ তিনি বিশ্বাস করেছেন মানুষেরই চৈতন্যকে : ‘সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ/.../এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।/...পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;/মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।’ জীবনের প্রতি রেখেছেন কী নিবিড় বিশ্বাস : ‘মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,/না এলেই ভালো হ’তো অনুভব ক’রে;/এসে যে গভীরতর লাভ হ’লো সে-সব বুঝেছি/.../দেখেছি যা হ’লো হবে মানুষের যা হবার নয়—/শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।’
৩.
তবে, আমরা এখন যে পৃথিবীতে বেঁচে আছি, তার চেহারা ও চরিত্র, তার করুণ ও কঠোর রূপ, তার ইতরতা, রহস্য ও প্রহসন—তাবত্ কিছুকে তিনি জীবন দিয়ে দেখেছেন, এবং তাঁর কবিতা এসবের প্রগাঢ় ডকুমেন্টেশেন। যখন ‘ক্যাম্পে’ পাঠ করি, শিউরে উঠি, মানুষের জীবনের শিকার-শিকারি সম্পর্ক কী তীব্রতা নিয়ে এখানে উপস্থিত : ‘মৃত পশুদের মতো আমাদের মাংস ল’য়ে আমরাও প’ড়ে থাকি;/বিয়োগের— বিয়োগের— মরণের মুখে এসে পড়ে সব/ঐ মৃত মৃগদের মতো—/প্রেমের সাহস সাধ স্বপ্ন ল’য়ে বেঁচে থেকে ব্যথা পাই, ঘৃণা-মৃত্যু পাই;/পাই না কি?/...বন্দুকের শব্দ তবু চুপে-চুপে ভুলে যেতে হয়।/ক্যাম্পের বিছানায় রাত তার অন্য এক কথা বলে;/যাহাদের দোনলার মুখে আজ হরিণেরা ম’রে যায়/হরিণের মাংস হাড় স্বাদ তৃপ্তি নিয়ে এল যাহাদের ডিশে/তাহারাও তোমার মতন;/ক্যাম্পের বিছানায় শুয়ে থেকে শুকাতেছে তাদেরো হূদয়/কথা ভেবে— কথা ভেবে— ভেবে।/ এই ব্যথা— এই প্রেম সব দিকে র’য়ে গেছে—/কোথাও ফড়িঙে-কীটে- মানুষের বুকের ভিতরে/আমাদের সবের জীবনে।/বসন্তের জোছনায় ওই মৃত মৃগদের মতো/আমরা সবাই।’
এইভাবে, আমাদের অন্তর্গত বেদনার এই কবি, জীবনানন্দ দাশ, সমকালীন থেকে চিরসমকালীন হয়ে আমাদের ভেতরে প্রবহমান থাকেন। আমাদের জীবনে, এই একুশ শতকী নারকী জীবনেও, তাঁর কাছে আমাদের হূদয়ের ঋণ ক্রমাগত বেড়ে চলে।
জীবনানন্দ দাশ [১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯—২২ অক্টোবর ১৯৫৪]
