আতিথেয়তা ও মেহমানদারি মানুষের পারষ্পরিক বন্ধন দৃঢ় করে। মানবিক সৌহার্দ বৃদ্ধি করে। মেহমানদারি সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। এতে বড় আনন্দ ও পুণ্য রয়েছে। এটি কল্যাণ ও মহত্ত্বের পরিচায়ক। পাশাপাশি এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। সকল নবী-রাসুলদের আদর্শ। নবীজি (স) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানের সমাদর করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১৩৬) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, ‘যে মেহমানদারি করে না, তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৭৪১৯) আরেক হাদিসে নবী করিম (স) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-কে লক্ষ্য করে বলেন, ... নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার মেহমানের হক রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১৩৪)। আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ)ও সর্বপ্রথম পৃথিবীতে মেহমানদারির প্রথা চালু করেন। আতিয়্যা আওফি (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল (স)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহতায়ালা ইবরাহিম (আ)-কে এ কারণে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন যে, তিনি মানুষকে খানা খাওয়াতেন, বেশি বেশি সালাম দিতেন আর মানুষ রাতে ঘুমিয়ে পড়লে তিনি নামাজ আদায় করতেন। (তাম্বিহুল গাফিলিন)
নবীজি (স)-এর কাছে মেহমান এলে তিনি খুব খুশি হতেন। তাদের আপ্যায়ন করতেন। তিনি ছিলেন অতিথিপরায়ণতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেক সময় মেহমানদারি করতে গিয়ে তাকে এবং তার পরিবারকে অনাহারে থাকতে হতো। একবার বনু গিফার গোত্রের এক লোক রাসুল (স)-এর মেহমান হলেন। মহানবী (স) আগের দিন অভুক্ত ছিলেন। যেদিন মেহমান এলেন, সেদিন ঘরে ছাগলের দুধ ছাড়া আর কিছু ছিল না। নিজে অনাহারি হয়েও আমাদের রাসুল (স) সেই মেহমানকে ছাগলের দুধের সবটুকু খাওয়ালেন। কিন্তু অতিথিকেও বুঝতে দিলেন না যে, তিনি ক্ষুধার্ত। পবিত্র কোরআনে মেহমানদারি সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। যদিও বা নিজেরা ক্ষুধার্ত থাকে। আর যারা স্বভাবজাত লোভ-লালসা এবং কামনা থেকে মুক্তি লাভ করে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা হাশর : ৯)। নবীজি (স) বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত খাবারের দস্তরখান মেহমানের সামনে বিছানো থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরেশতারা মেজবানের জন্য রহমতের দোয়া করতে থাকেন।’(আল মুজামুল আওসাত) মেহমানদারি বলতে শুধু পেট ভরে খাওয়ানো নয়; বরং পরষ্পর মানবিকতা, হূদ্যতা ও ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ উদ্দেশ্য। মেহমানদারির শিষ্টাচারের প্রতি যত্নবান হলে মেহমানদারিটা মেজবানের ওপর ভারি কিংবা কষ্টকর মনে হবে না। সুরা আহজাবেও এ ধরনের কিছু শিষ্টাচার শেখানো হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! নবীর ঘরে (অনুমতি ছাড়া) প্রবেশ কর না। অবশ্য তোমাদেরকে আহার্যের জন্য আসার অনুমতি দেওয়া হলে ভিন্ন কথা। তখন এভাবে আসবে যে, তোমরা তা প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকবে না। কিন্তু যখন তোমাদেরকে দাওয়াত করা হয় তখন যাবে। তারপর যখন তোমাদের খাওয়া হয়ে যাবে তখন আপন-আপন পথ ধরবে; কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়বে না।’ (সুরা আহজাব : ৫৩)
আপ্যায়ণের সময়সীমা :এ ব্যাপারে নবীজি (স) বলেন, ‘আল্লাহ ও পরকালের প্রতি যে ঈমান রাখে সে যেন মেহমানের সমাদর করে এবং তার হক আদায় করে। নবী (স)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, মেহমানের হক কী? তিনি বললেন, এক দিন এক রাত, সর্বোচ্চ মেহমানদারি তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত, এর অতিরিক্ত হলো সদকা’ (বুখারি)।
লেখক : মুফতি ও মুহাদ্দিস
