মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-২০২০

ফলাফল নিয়ে সংশয় বাড়ছে

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ২১:১১

শিফারুল শেখ

 

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটা অবান্তর বিষয়। নির্বাচনের দিন ফলাফল ঘোষণা করা হয় এবং সেটা পরাজিত প্রার্থী অনায়াসেই মেনে নেন। ফলাফল নিয়ে যত সমস্যা তা তৃতীয় বিশ্বেই দেখা যায়। কিন্তু এবারের চিত্রটা ভিন্নই মনে হচ্ছে এখন পর্যন্ত। কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবারই বলেছেন, তিনি পরাজিত হলে মনে করা হবে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়নি। নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হলে তিনিই জিতবেন। নির্বাচনের ফল মেনে নেবেন কি-না, সেই বিষয়টিও স্পষ্ট করেননি। আবার সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনও তার দলের প্রার্থী জো বাইডেনকে বলেছেন, নির্বাচনের রাতেই যেন তড়িঘড়ি করে ফলাফল মেনে না নেওয়া হয়।

এক দেশে তিন প্রেসিডেন্ট!

বিবিসি জানায়, আইন বিশেষজ্ঞ এবং ম্যাসাচুসেটসের অ্যামহার্স্ট কলেজের অধ্যাপক লরেন্স ডগলাস একটি বই লিখেছেন যা গত আগস্টে প্রকাশিত হয়েছে। ‘উইল হি গো? ট্রাম্প অ্যান্ড দ্য লুমিং ইলেকশন মেল্টডাউন ইন ২০২০’ নামের বইটিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও সংবিধান পরীক্ষা করে সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প নির্বাচনের ফলাফল মানতে অস্বীকার করলে কী কী হতে পারে। ডগলাসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পদ্ধতি এ ধরনের সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত নয়। তার কথায় মার্কিন সংবিধান শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করে না বরং ধরেই নেয় যে এমনটাই হবে। ২০০০ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট আল গোর পপুলার ভোট বেশি পেলেও সাংবিধানিক সংকট এড়াতে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এছাড়া ১৮০০ ও ১৮৭৬ সালেও নির্বাচনের ফলাফল অস্পষ্ট হলে সংবিধান ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে আপসরফা হয়েছিল, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর ঘটেছিল।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে জিতেছেন তা স্পষ্ট না হলে কংগ্রেসের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হবেন। অধ্যাপক লরেন্স ডগলাস মনে করছেন, সেক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি হয়তো ন্যান্সি পেলোসিকে শপথগ্রহণ করাবেন, আবার অন্যদিকে আরেক বিচারপতি ক্ল্যারেন্স টমাস শপথগ্রহণ করাবেন ট্রাম্পকে। এমনও হতে পারে যে, কেউই শপথ নিলেন না এবং ট্রাম্প, বাইডেন ও পেলোসি—এরা সবাই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব এবং অধিকার দাবি করতে পারেন। ডগলাস লিখছেন, এর মধ্যে ট্রাম্প হয়তো এমন সব টুইট করা শুরু করলেন যা সহিংসতা উসকে দিতে পারে। তিনি বলছেন, মনে রাখতে হবে এদেশে প্রচুর বন্দুক আছে এবং এর অধিকাংশ আছে প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে উগ্র সমর্থকদের হাতে।

শেষ ভরসা সুপ্রিম কোর্ট না সামরিক বাহিনী!

নির্বাচনে হেরে গেলে এবং দুই প্রার্থীর মধ্যে সমর্থনের ব্যবধান কম হলে ট্রাম্প ফেডারেল কোর্টে সেই ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, এমন আশঙ্কা বাড়ছে। সেক্ষেত্রে ইলেক্টোরাল কলেজের যথেষ্টসংখ্যক ভোটের দৌলতে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করতে পারেন। উল্লেখ্য, আমেরিকার ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত শুধু ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সংশয় দেখা গিয়েছিল। রিপাবলিকান দলের প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী আল গোরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর সুপ্রিম কোর্ট বুশকেই জয়ী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এজন্য ৩৬ দিন সময় লেগেছিল চূড়ান্ত ফল জানতে। এবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থক বিচারকই বেশি সুপ্রিম কোর্টে। তিনিও বলেছেন, নির্বাচনের ফল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রায় ট্রাম্পের পক্ষেই যাবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ট্রাম্পের এক জন মিত্র সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও বলেন, যদি সুপ্রিম কোর্ট জো বাইডেনের পক্ষে রায় দেয় তা হলেও রিপাবলিকানরা নির্বাচনের ফল মেনে নেবে। জো বাইডেন বলেছেন, হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্পকে সরিয়ে দিতে সামরিক বাহিনী ডাকা হতে পারে।

সমস্যা পোস্টাল ব্যালট নিয়ে

এবার করোনা ভাইরাসের কারণে ডাকযোগে ভোট দেওয়া বেড়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৬ কোটি মানুষ আগাম ভোট দিয়েছেন। গত বছর এই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ। এবার ডাকযোগে ভোট দিতে ডেমোক্র্যাটরা ব্যাপক উত্সাহ দিচ্ছেন। ডেমোক্র্যাট ভোটও তাই বেশি পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডাকযোগে দেওয়া ভোটের ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন ট্রাম্প। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই পোস্টাল ব্যালটের কারণে বিশাল কারচুপির আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে। তবে বিষয়টিকে ঘিরে ভুয়া খবর সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছে এ সংস্থা। কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনি ফল বিলম্ব ঘটলে রুশ হ্যাকাররা স্থানীয় নির্বাচনি অবকাঠামোতে সাইবার হামলা চালাতে পারে এবং সেক্ষেত্রে তারা ট্রাম্পের বিজয় নিশ্চিত করবে।

পোস্টাল ব্যালট গ্রহণ এবং গণনায় বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন নিয়ম। অধিকাংশ রাজ্যে ভোটের দিনের (৩ নভেম্বর) মধ্যে ব্যালট পৌঁছাতে হয়। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়াসহ আরো কিছু রাজ্য আছে যেখানে নির্বাচনের দিন ব্যালট পাঠালেই হয়। সেটা পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহও লাগতে পারে। পোস্টাল ব্যালটের স্বাক্ষরের সঙ্গে রেজিস্ট্রেশন কার্ডের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখতেও সময় লাগে। ফ্লোরিডাসহ কিছু রাজ্যে ৩ নভেম্বরের আগেই পোস্টাল ব্যালট গণনা করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ রাজ্যেই ৩ নভেম্বরের পর ভোট গণনা করা হয়। তাই গুনতে সময় লাগে। যদিও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে যান ইলেক্টোরাল ভোট গণনা করে।