‘রিভার অব স্মোক’ উপন্যাসের চরিত্র ফরাসি এতিম পলেটকে আমরা প্রথম দেখি হংকংয়ের এক বন্দরে। সেখান থেকে লেখক তাকে তুলে দিলেন হংকংয়ে নোঙর করা এক জাহাজের ডেকে। সেখান থেকে ম্যাকাও দ্বীপের অদূরে ‘আদিম, ঝোড়ো হাওয়া বিধৌত’ এক দ্বীপে। ‘গোল্ডেন ক্যামেলিয়া’ নামে এক দুর্লভ পুষ্পের সন্ধানে উপন্যাসের গোটা সময়টা এখানে অপেক্ষার মধ্যে পার করে সে। তাকে খবর পাঠাবে ক্যান্টনের বিদেশি কোয়ার্টারে বসবাসকারী তার এক বন্ধু।
ঊনবিংশ শতকে দক্ষিণ চীনের এসব বন্দর গিজগিজ করত দিগিবদিক থেকে আগত ভাগ্যান্বেষী মানুষের ভিড়ে। গ্রন্থের রচয়িতা একুশ শতকের খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষ নিজেও প্রায় তারই প্রতিরূপ। সকালে গোয়া, তো রাতে নিউ ইয়র্ক। দুটি স্থানকেই আপন বাড়ির মতো অনুভব করেন। প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছেন অক্সফোর্ডে। কিন্তু মানুষকে তিনি যাচাই করেন লেখকের দৃষ্টিতে। ২০০৮ সালে প্রকাশ হয় তাঁর ‘ইবিস ট্রিলজি’র প্রথম খণ্ড ‘সি অব পপিজ’। বিষয়বস্তু আফিম যুদ্ধ। চীনে আফিম বিক্রি বাণিজ্যের সাথে ভারতের জড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাস নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। ‘ভারতীয় ইতিহাসের এ পর্বটি আমাদের সবারই প্রায় অজানা। আমার জন্য এ একপ্রকার আবিষ্কার,’ বলেন অমিতাভ।
ইবিস ট্রিলজির মূল প্রতিপাদ্য অভিবাসন। ঘোষের প্রিয় বিষয়। ১৯৮৬ থেকে মানবিক অভিবাসনের ওপর লিখেছেন ছয়টি উপন্যাস। তাঁর চরিত্রগুলো ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যধারী—বাংলাদেশে আগত ইংরেজ, মিশরে অবস্থানকারী ভারতীয়, ভারতে প্রত্যাবাসিত বর্মী। এক-দু শ’ বছর আগের এসব চরিত্র যেন আগামীদিনের বৈশ্বিক গ্রামের প্রথম সোপান নির্মাতা।
ট্রিলজির দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে এসেছে ‘রিভার অব স্মোক’। প্রথম সাক্ষাতের চমক আর পৃথিবীর মধ্যে ছোট ছোট পৃথিবীর গল্প মিশে আছে এখানে। মরিশাসের সেই পরিত্যক্ত উদ্যানের মতো। ভারতীয় গুল্মের সাথে যেখানে জড়াজড়ি করে বেঁচে থাকে ব্রাজিলের লতা। নিজস্ব ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার আলোকে গল্পের উপাদান নির্মাণ করেছেন ঘোষ। তাঁর পূর্বপুরুষের অনেকেই ছিলেন বার্মা। ঘোষের বাবা নিজেই এক কূটনীতিক। কলকাতায় জন্ম নেয়া ঘোষ নিজে বড় হয়েছেন কলম্বো আর ঢাকায়। ১৯৭৮ সালে অক্সফোর্ডের উদ্দেশে ভারত ছাড়েন। আর ফিরতে চাননি কখনো। একসময় তার উপলব্ধি হলো, স্থান আর ব্যক্তির ভেদাভেদ বিলীন হয়েছে আজকের পৃথিবীতে। ‘এখন মানুষ আমেরিকা যাচ্ছে, কিন্তু তাকে তার জন্য আমেরিকান হয়ে যেতে হচ্ছে না। আরব, চীনা বা ভারতীয়, যা খুশি তাঁরা হতে পারেন। ফেরার সুযোগ তো থাকছেই। জাতিগত পরিচিতির সীমারেখা বিলীন হয়েছে বর্তমান দুনিয়ায়,’ মন্তব্য করেন ঘোষ।
অনেক সময় তাকে তুলনা করা হয় সালমান রুশদি কিংবা বিক্রম শেঠের সাথে। ভারত কিংবা ভারতের মানুষের জন্য অবশ্য তাঁর দরদ অতটা প্রকাশ্য নয় যতটা তিনি আগ্রহী শেকড়চ্যুত মানুষের গল্প বলতে। বাণিজ্য, বিপ্লব কিংবা কৌতূহলতাড়িত হয়ে তাঁর চরিত্রগুলো ঘুরে বেড়ায় দুনিয়া জুড়ে। ট্রিলজিতে এরা সবাই পরস্পরের ‘জাহাজ-ভাই’।
লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রথম কুড়ি বছর তাঁর গ্রন্থ ছিল প্রায় দুর্বোধ্য। এগুলোর মানে কী, প্রশ্ন করত পাঠক। আজ স্পষ্ট, ঘোষ লিখেছেন বিশ্বায়ন নিয়ে, এমন এক সময়ে, যখন এমন কি শব্দটারই জন্ম হয়নি। এখন অবশ্য বিপুল পাঠক তৈরি হয়েছে তাঁর, মার্কিন মুলুকে। ‘সি অব পপিজ’-এর সাথে সাথে এশিয়া এবং ইউরোপ ছাড়িয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছে তাঁর রচনা। আফিম ব্যবসার ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে রচিত এ গ্রন্থ। ২০০৮ সালে ম্যানবুকার পুরস্কারের চূড়ান্ত মনোনয়ন লাভ করে এটি।
১৯৮৮ সালে প্রকাশ হয় ‘দ্য শ্যাডো লাইনস’, দেশবিভাগের শিকার এক বাঙালি পরিবারের কাহিনি। ২০০৫ সালে সু্ন্দরবনের পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে লেখেন ‘দ্য হাংরি টাইড’। সমালোচক নীলাঞ্জনা রয় তাঁর সম্পর্কে বলেন, আমরা কী ভাবতে যাচ্ছি, সেটা আগেভাগেই টের পায় ঘোষ।
কায়রোর তাহরির স্কয়ারে তরুণ বিদ্রোহের ইঙ্গিত পাওয়া যাবে মিশর নিয়ে তাঁর প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ইন অ্যান অ্যান্টিক ল্যান্ড’-এর পাতায় পাতায়। গবেষণার কাজে সেখানে গিয়ে ১৯৯২ সালে এটি রচনা করেন তিনি। এতে রয়েছে ভিন্ন দুটি সময়ের ভিন্ন দুটি চরিত্রের সমান্তরাল বয়ান। একজন একুশ শতকের ছাত্র, মাঠপর্যায়ের গবেষণা করতে ঘুরে বেড়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অন্যজন বারো শতকের এক ভারতীয় ক্রীতদাস। প্রাচীন লেখা আর প্রকাশনা ঘেঁটে তার গল্প তুলে আনেন ঘোষ।
আরব বসন্ত বিষয়ে আমেরিকানদের সতর্ক করে ঘোষ বলেন, বিদ্রাহী মিছিলে ওরা অনেকেই শুধু স্বাধীনতা নয়, চায় আরো বেশি। ওরা চায় আরো শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্র, ইউনিয়নের মাধ্যমে আরো বেশি মজুরি এবং আরো বেশি সুবিধা। অবাধ পুঁজিতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদী অবশেষ কিংবা বল্গাহীন সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে শাণিত কলম তাঁর। আদর্শবাদিতা নয়, তিনি জানাতে চান, বিশ্বায়ন রোমাঞ্চকর হতে পারে, কিংবা হতে পারে চরম সর্বনাশের উত্স।
তার বৈপরীত্য পরস্ফূিট হয় ‘রিভার অব স্মোক’-এর চরিত্র বাহরামের কথায়। মুক্তবাণিজ্যের দেবতাকে তুষ্ট করতে আফিম চোরাচালানের সাথে জড়িয়ে নিজেকে সে যেখানে এনেছে, তাতে নিজের ওপরই বীতশ্রদ্ধ এ পারসি বণিক। ‘ক্যাণ্টনই তার আত্মার নিবাস। এ শহর তাকে দিয়েছে অর্থকড়ি, বন্ধুবান্ধব, সামাজিক অবস্থান, এক পুত্র; এই শহর তাকে শিখিয়েছে প্রেম আর জীবনের অর্থ। এই শহর ছাড়া সে যেন এমন এক মানুষ মাটিতে যার ছায়া পড়েনি।’ তার আমেরিকান ঘড়ি ব্যবসায়ী বন্ধু জাদিগ তাকে কথা বলতে প্রাণিত করে তাদের পক্ষে, ‘যারা না ব্রিটিশ, না আমেরিকান, না চীনা।’
এক শতক পর, তাদের সবার কথা মূর্ত হয়ে ওঠে অমিতাভ ঘোষের কলমে।
