শব্দের সৃষ্টিশক্তিতে বাস্তবভুবন পরিক্রমায় বিমল গুহ

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২০, ২০:৪০

 ‘কমিউনিকেশন’-এর তত্ত্ব তাত্পর্য মাথায় রেখেও কবিতার দ্বিমাত্রিক চরিত্রের বাস্তবতা মেনে নিতে অসুবিধা হয় না। তা যেমন বিনোদনের উপভোগ্যতায় তেমনি সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশে বলতে হয়, বহু পুরোনো কথা বিষয় ও প্রকরণের প্রতিযোগিতায় সামঞ্জস্য বিধানে কবিতার সফল পরস্ফুিটন ঘটতে অসুবিধা নেই। বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের পথ ধরে কবিতা প্রায়শ রাজনীতিসংশ্লিষ্ট বা দিকনির্দেশক। প্রতিবাদী এ ধারাটির সূচনা পঞ্চাশের দশক তথা বিশেষভাবে একুশের ভাষা-আন্দোলনোত্তর সময়পর্ব থেকে। এর ক্রমবিকাশ ষাটের দশকের আবর্তে, উত্তাল তরঙ্গে চৈতন্যের জাগরণে যার সর্বোত্তম প্রকাশ ঊনসত্তর হয়ে সত্তরের দশকে মুক্তিস্নানে মূলত রক্তাক্ত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। একঝাঁক কবি তাদের কবিতার বর্শা হাতে ময়দানে হাজির। মসিযুদ্ধ নয় যেন অসিযুদ্ধ।

সত্তরের দশকের কবি হিসেবে পরিচিত (যদিও দশক পরিচিতি নানা কারণে বিতর্কিত) বিমল গুহ আপন গুণপনাতেই বাংলাদেশের কাব্য-অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার কাব্যভাবনায় এমন সত্যের প্রকাশ ঘটেছে যে, ‘কবিতার ইতিহাস এক অর্থে সমাজ-সংস্কৃতিরই ইতিহাস। সমাজ পরিবর্তনের তাগিদ কবিরা যখন অনুভব করেন, তখন তার রূপায়ণ কবিতার মাধ্যমে তারা করে থাকেন। সুতরাং সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কবিতাও একটি ভূমিকা পালন করে থাকে। এমনকি স্বাধীনতাযুদ্ধের দিনেও আমরা দেখেছি কবিতার শব্দ বুলেটের মতো আঘাত হেনেছে প্রতিপক্ষের মনোভূমিতে।’ পাশাপাশি কবিতার নান্দনিক রূপশিল্পে তার রয়েছে সমান বিশ্বাস ও আগ্রহ।

‘কবিতার দায়, কবিতার অঙ্গীকার’ বিশ শতকের প্রথম দিক থেকেই বাংলা কবিতায় বিশেষ জপ পরিগ্রহ করে, যা চল্লিশের দশকে এসে ঝোড়ো হাওয়ার চরিত্র অর্জন করেছিল। কবিতার দায়, কবিতার মুক্তি ঘটে বিক্ষুব্ধ আত্মপ্রকাশে। সত্তরের দশকে এসে বাংলাদেশের কবি বিমল গুহই-বা ওই ভিন্নপথের যাত্রিক হবেন না কেন সময়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে। মাটি ও মানুষের আর্তনাদ তাকে বিচলিত করবেই, প্রতিক্রিয়া ঘটাবে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী পঙিক্তমালার প্রকাশে। শব্দ হয়ে ওঠে লক্ষ্য অর্জনের তপ্ত সীমা। তবে তার শব্দচয়নে কাব্যভাষার পরিবর্তন ঘটে বিষয়ের আত্যন্তিক প্রয়োজনে। বিশেষ করে, প্রাকরণিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশে। বিশেষ বিশেষ উপমা, প্রতীক ও চিত্ররূপের নির্ভরতায়। সেখানে থাকে বিষয়ানুগ ইঙ্গিতার্থক তাত্পর্য এবং কিছুটা হলেও রঙের উদ্ভাস। কবিতার এ জাতীয় বৈশিষ্ট্য দশক দুই আগে দেখা গেছে একুশের কবিতায়। মাটি, মানুষ ও প্রকৃতি নিয়ে ত্রিবিধ বাস্তবতায়।

বিমল গুহর কবিতায় মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও ব্যক্তিক অনুভবের গভীরতা সমান আন্তরিকতায় উপস্থিত। তিনি ব্যক্তিগত ভাবনার প্রকাশে শুদ্ধতার কথা বলেছেন। শুদ্ধতার সঙ্গে সৌন্দর্যেরও আত্মিক সম্পর্ক, নান্দনিক সম্পর্ক। কবিকে তাই দ্বিমাত্রিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে বিষয়ের সঙ্গে প্রাকরণিক সৌন্দর্যের মিলন ঘটিয়ে শব্দ ও ধ্বনির বৈচিত্র্য নিয়ে পথ চলতে হয়। বিমল গুহর কবিতা এ বিষয়ে সচেতনতার স্বাক্ষর বহন করে। সেখানে স্বাদেশিকতায় সিক্ত সমাজ-সচেতনতা কবির রাজনৈতিকবোধ ঋদ্ধ করেও মতাদর্শগত সংকীর্ণতার প্রকাশ ঘটায়নি।

সত্তরের দশক আমাদের জন্য হয়ে উঠেছিল মুক্তির দশক যদিও বহুখ্যাত স্লোগানের তুলনায় ভিন্ন অর্থে। তথাপি স্বাধীন স্বদেশ কম পাওয়া নয়, যদিও সে স্বদেশ শ্রেণিবিশেষের স্বার্থপূরণে অঙ্গীকৃত। তবু সে অর্জনে কম রক্ত ঝরেনি। বিনিময়ে : ‘রক্তলাল-সূর্য আঁকা স্বাধীন পতাকা,../ উত্তোলিত হাতের মুঠোয় জোড়া জোড়া রক্ত গোলাপ’। অনেক পিতার অন্তর্ধানে’, অনেক পিতার রক্তভাসানে, অনেক মাতার ক্ষতবিক্ষত লাশের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন স্বদেশে পাথরচাপা কষ্ট বুকে চেপে কবিকে লক্ষ করতে হয় : ‘একদল নষ্ট মানুষ দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়,/ ছুঁড়ে দেয় নষ্ট আওয়াজ এই নষ্ট প্রজন্মের দিকে’। অবাঞ্ছিত পরিবেশে মনে পড়ে যায় একাত্তরের ঘাতক সময়ের বীভত্স তত্পরতা—‘কী বীভত্স সেই কালো দুপুরের রোদ!/ আমার চোখের মণি ছিটকে পড়ে আকাশে আকাশে’।

আলোচনা সংক্ষিপ্ত করতে উদ্ধৃতির কমতি। সবশেষে কবিদের পরম আরাধ্য প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে বিমল গুহেরও মুগ্ধ উচ্চারণ আমাদের নজর এড়ায় না। প্রেম প্রেয়সী ও আকাঙ্ক্ষা একাকার করা অনুভূতির প্রকাশ ঘটান কবি বিমল গুহও। এবং তা কাব্যচর্চার সূচনালগ্ন থেকেই : ‘আগুন আকাশকে ছুঁতে পারে না/ বিশ্বাস আকাশকে ছোঁয়,/ বাতাস পাহাড়কে নাড়াতে পারে না/ প্রেম পাহাড়কে নাড়ায়;...’। অনুভবের গভীর তাত্পর্যে ঋদ্ধ কয়েকটি পঙিক্ত। তাই দু-তিনটে পঙিক্ত উদ্ধারে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা : ‘তুমি এলে মুখাবয়ব সূর্যের প্রথম আলোর মতো দীপ্যমান’। এ জাতীয় কয়েকটি পঙিক্ত প্রেমিক কবিকে বুঝে নেবার পক্ষে যথেষ্ট। উপমা, প্রতীক ও চিত্রকল্পেও তার কবিতায় আপন বৈশিষ্ট্য তৈরি করেন বিমল গুহ। সেখানে কবি অনেকটাই সংযত এবং হার্দ্য। আতিশয্য তার স্বভাবে নেই। তবে এ কথা ঠিক, যা আগে বলা হয়েছে যে শব্দের মহিমা নিয়ে ব্যবহারিক প্রাধান্য নিয়ে কবি বিমল গুহ একটু বেশি মাত্রায় সচেতন, তার বক্তব্যে তা স্পষ্ট।