কলেজ ক্যাম্পাসের হ্রদ ও বার্নাদিতার চিরকুট

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৯:২৭

 

ইদানীং ইমেইল ও ইন্টারনেটে স্ক্যাইপ কল চালু হয়ে যাওয়াতে ডাকে চিঠিপত্র তেমন আর আসে না। তাই দুপুরবেলা মেইলবক্স পরিষ্কার করতে গিয়ে ফরগেট-মি-নট নামে লতানো নীল ফুলের ছবি আঁকা খামে একটি চিঠি দেখতে পেয়ে অবাক হই! ভেতরে কিন্ডার গার্টেনের বাচ্চার মতো গোটা গোটা হরফে খুব মেহনত করে লেখা ‘ধন্যবাদ’ শব্দটি। বাঙালিরা সচরাচর ধন্যবাদ দিয়ে চিঠিচাপাটির মুখপাত করেন না। এ চিঠিও কোনো বাঙালি আমাকে পাঠাননি। ধন্যবাদ ছাড়াও এ পত্রে আছে পরিষ্কার বাংলায় অত্যন্ত পার্সোনাল দুটি চরণের চিরকুট। তার নিচে প্রেরকের কোনো স্বাক্ষর নেই বটে, তবে এনভেলাপে ইংরেজিতে লেখা আমার ঠিকানার হস্তাক্ষর থেকে আন্দাজ করতে কোনো অসুবিধা হয় না যে, এ ব্যক্তিগত চিরকুটটি এসেছে বার্নাদিতার কাছ থেকে। বছর দুয়েক আগে আমি যুক্তরাষ্ট্রের স্প্রিংফিল্ড কলেজে পড়াতাম। তাই স্মৃতিতে ঝলসে ওঠে কলেজের লোহিত ইটের গড়া দালানটি। ছাত্রী বার্নাদিতাকে ক্লাসে সকলে ‘দিতা’ বলে ডাকত, যদিও দিতার শ্রবণ করার কোনো ক্ষমতা নেই। সাংস্কৃতিক দিক থেকে সে হিস্পানিক, ইংরেজি ছাড়াও মাতৃভাষা স্প্যানিশে তার দখল আছে। পুরো এক সেমিস্টার সে আমার ছাত্রী ছিল। ঠিক বুঝতে পারি না দিতা বাংলায় চিরকুটটি লিখল কীভাবে?

এ চিরকুটটিতে সমস্যা দুটি। প্রথমত, সে প্রেরক হিসেবে কোনো ঠিকানার উল্লেখ করেনি। সুতরাং জবাব দেওয়া মুশকিল। দ্বিতীয়ত, সে বাংলায় চিরকুট লিখল কীভাবে? দিতা কথা বলতে পারে না একেবারে, তাই স্পেশাল-নিড স্টুডেন্ট হিসেবে আমার ক্লাস অ্যাটেন্ড করার অনুমতি নেয়। সে সাইন-ল্যাঙ্গুয়েজে দক্ষ একজন ইন্টারপ্রেটার নিয়ে ক্লাসে আসত। লেকচারের সময় সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের ইন্টারপ্রেটার আমি যা বলছি, তা ইশারায় অনুবাদ করে দিত। আমার দ্রুত কথা বলার প্রবণতা আছে, তাই মাঝে মাঝে ইন্টারপ্রেটার সবকিছু ঠিক বুঝতে পারত না; তারপর মৌখিক বচন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে ট্রান্সফার করতে সময় লাগে অনেক বেশি। সুতরাং সে আমার বক্তব্যের খানিকটা যখন হাতের ইশারায় অনুবাদ করেছে, ততক্ষণে আমি আলোচনা করছি অন্য প্রসঙ্গে। দিতা এ নিয়ে কখনো কমপ্লেইন কিছু করেনি। কিন্তু তার মুখে রোদমেঘের পালাবদলের মতো দ্রুত পরিবর্তিত হতো এক্সপ্রেশন। মাঝে মাঝে আলোর দিকে হেলে পড়া সূর্যমুখীর মতো গ্রীবা বাঁকিয়ে, সে আমার ঠোঁটের সঞ্চালনের সাথে ইন্টারপ্রেটারের ইশারা আত্মস্থ করতে চেষ্টা করত; আর লেকচার দিতে দিতে আমি তার মুখে আয়নার মতো পরিষ্কার দেখতে পেতাম, কোনো প্রসঙ্গ বুঝতে না পারার অব্যক্ত বিভ্রান্তি।

ক্লাসের বিরতিতে অ্যাকাডেমিক প্রসঙ্গগুলো কীভাবে তাকে এক্সপ্লেইন করা যায় তা জানতে চাইলে, সে এমনভাবে আমার দিকে তাকাত—যেন এক পরিযায়ী পাখি অনেক উড়ে, অবশেষে শ্রান্ত হয়ে, হঠাত্ করে তালাশ পেয়েছে বাজপড়া বৃক্ষের, যার ডালে বসে একটু জিরানো যায়। অফ পিরিয়ডে আমি তার সাথে বসে যে প্রসঙ্গগুলো সাইন ল্যাঙ্গয়েজের ইশারায় সঠিকভাবে অনূদিত হয়নি, তা আবার খুব ধীরলয়ে এক্সপ্লেইন করার প্রস্তাব দেই। তাতে সে গণ্ডদেশে অরুণাভা ফুটিয়ে গ্রীবা হেলিয়ে রাজি হয়।

প্রথম অ্যাপয়েন্টমেন্টে সে নাবাহো ডিজাইনের ভেস্টের সাথে ম্যাচ করা স্কার্ফ পরে আসে। বয়সের তুলনায় গম্ভীর গোছের ভেস্ট ও সুচারু স্কার্টে তাকে খানিকটা প্রফেশনাল দেখায়। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের ইন্টারপ্রেটার না আসাতে সমস্যা বাঁধে। সে নোটপ্যাডে পেনসিল দিয়ে লিখে জানায়, একটি সোশ্যাল সার্ভিস অ্যাজেন্সি তার একাডেমিক ডেভেলপমেন্টের জন্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ইন্টারপ্রেটার দিচ্ছে। ইন্টারপ্রেটার তাকে শুধু ক্লাস চলাকালে সাহায্য করে। ক্লাসের বাইরে ইন্টারপ্রেটার জোগাড় করা মুশকিল। কারণ—তার জন্য প্রয়োজন এক্সট্রা বাজেটের। তো আমরা নোটপ্যাডে পেনসিল দিয়ে লিখে কথা চালাচালি করি। অ্যাপয়েন্টমেন্টে সে নির্ধারিত সময়ের চেয়েও অনেক বেশি সময় নেয়। ক্লাস প্রজেক্ট হিসেবে—প্রতিবন্ধী মেয়েদের বয়ফ্রেন্ড বা মেইল পার্টনার পাওয়ার সমস্যা নিয়ে সে রিসার্চ করতে চায়। তারপর কীভাবে যেন পত্রিকায় হালফিল মুদ্রিত অদ্ভুত এক সংবাদের বিষয়টি আমাদের আলোচনায় চলে আসে। সে নোটপ্যাডে লিখে জানায়, তিমি মাছের সংলাপের ইন্টারপ্রিটেশন নিয়ে আজকাল রিসার্চ হচ্ছে, তার সংবাদ আমি জানি কি? ওই দিন তার ফিরে যাওয়ার বোধ করি কোনো তাড়া ছিল না। খুব রিল্যাক্সড্ভাবে তার তাম্র বর্ণের চুল থেকে রাবারের ব্যান্ড খুলে, তা কব্জিতে জড়িয়ে মৃদু ভ্রূকুটি করে সে অ্যাপয়েন্টমেন্টের সমাপ্তি টানে। তারপর আমরা নীরবে হেঁটে যাই, কলেজের গাছপালায় ছায়াচ্ছন্ন হ্রদের পাড় ধরে।

সায়েন্স ফেকাল্টির যে দিকে আমার পরিচিতি নেই, সেখানকার হ্রদ-পাড়ে, ছাদখোলা আঙ্গুরলতায় ছাওয়া ক্যাফেটেরিয়ায় আমি আরো বার কয়েক দিতার সঙ্গে বসেছি। নোটপ্যাডে লিখে লিখে আমাদের অ্যাকাডেমিক আলোচনা কখনো জুতমতো জমেনি। একবার আইস-টি খেতে খেতে আমরা বেশ কিছুক্ষণ মেক্সিকো থেকে পরিযায়ী হয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন ছুঁয়ে, কানাডা অব্দি উড়ে যাওয়া মানার্ক বাটারফ্লাই নামে এক পরিব্রাজক প্রজাপতির কথা বলি। নোটপ্যাডে লিখতে লিখতে, উড্ডীন প্রজাপতির চিত্র স্কেচ করতে করতে, দিতা চোখে গাঢ় অনুযোগ ফুটিয়ে লেখে, ‘আই ডোন্ট থিংক ইউ আর রেডি টু একমপেনি মি টু ওয়াচ বাটারফ্লাই মাইগ্রেশন?’ আঙ্গুরকুঞ্জে ফিল্টার হয়ে তার খোলা কাঁধে এসে পড়েছে অটামের মৃদু সূর্যালোক, রশ্মিতে ঝিলমিল করছে মিহি সিল্কের রুপালি টপ, আর আভরণ ভেদ করে জলে ভাসা শাপলার জোড়া কলির মতো ফুটে উঠেছে তার স্তনবৃন্ত। উত্তরে আমি তার দিকে গাঢ়ভাবে তাকাই, তবে মৌন থাকি। সাথে সাথে স্প্রিংয়ের দম শেষ হয়ে যাওয়া পুতুলের মতো তার এক্সপ্রেশন থেকে মুছে যায় সব চঞ্চলতা। তারপর ভেসে আসা কচুরিপানার মতো ধীরে ধীরে তার মুখশ্রী ভরে যায় গাঢ় বিষাদে। দিতা নোটপ্যাডে ‘থ্যাংক ইউ’ শব্দটির বাংলা আমাকে লিখে দিতে বলে।

ওই দিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট শেষ না করে ফের নীরবে আমরা হেঁটে যাই হ্রদ-পাড়ে, জগিং ট্র্যাকের লাল সুরকি ছড়ানো পথ ধরে। অবশেষে কাচের ছোট্ট গ্রিনহাউজে এসে ঢুকি। পাইন গাছের পরিচ্ছন্ন প্রতিফলনে লেকের জল সবুজ হয়ে আছে। গ্রিনহাউজে ফুটেছে গাঢ় বেগুনি বর্ণের গুচ্ছ গুচ্ছ পেনজি ফুল। পেনজির অন্তর্গত বৃন্তে কোরকগুলো ভরে আছে সোনালি রেণুর বিচ্চুরণে। তার সামনে দিতা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে মৌন হয়ে। গ্রিনহাউজের অন্য প্রান্তে আজ ফুটেছে নীল বর্ণের ফরগেট-মি-নট ফ্লাওয়ার, তার নিচে মস্ত একটি ধূসর রক, আমরা কিছুক্ষণ এ পাথরে বসি। সে নোটপ্যাডে লিখে জানায়, ক্লাস প্রজেক্ট হিসেবে যে রিসার্চ শুরু করেছিল, তা শেষ করতে সে অপারগ। কোনো উপায় নেই তার নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার। সে প্রতিবন্ধী, তবে বয়ফ্রেন্ড জোটাতে তার সমস্যা কিছু নেই। ছেলেরা ভালোবাসে তার মুখের রিচ এক্সপ্রেশন। তার শরীরের রিদমিক গড়নে তারা একসাইটেড হয় দ্রুত। কিন্তু কেউ কমিট করতে চায় না। সে কথা বলতে পারে না, তাই কোনো কোনো ছেলে ফিজিক্যালি খুব অ্যাবিউসিভ আচরণও করে থাকে। আমি তাকে ক্লাস প্রজেক্ট হিসেবে ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিফলন-পত্র লিখতে বলি। উত্তরে সে নির্বাক চোখে কেবল তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।

সেমিস্টার শেষ হয়। দিতা ক্লাস প্রজেক্ট জমা না দিয়ে ইনকমপ্লিট পায়। আমি তার খোঁজ করি। শুনতে পাই—সে চুপচাপ বসে আছে হ্রদ-পাড়ে। ওদিকেও যাই একবার, কিন্তু দেখা হয় না। মনে হয়, চলে গেছে সে অন্য কোনো দিকে।

পরের সেমিস্টারে আমি ভিয়েতনামে কনসালটেন্সি করতে যাই। বছর দুয়েক পর আজকে আমার মেইলবক্সে তার চিরকুটটি পেলাম। তাকে বাংলায় ‘ধন্যবাদ’ শব্দ কীভাবে লিখতে হয় তা আমি দেখিয়ে দিয়েছিলাম, সত্যি। পত্রে আরো দুটি ব্যক্তিগত চরণ আছে, তা সে বাংলায় লিখল কীভাবে? তার সাথে কি অন্য কোনো বাঙালির যোগাযোগ হয়েছে? এ পত্রের সুন্দর একটি জবাব দিতে আমার আপত্তি কিছু নেই। কিন্তু দিতা প্রেরক হিসেবে ঠিকানা দিল না কেন?