মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান, সরাসরি বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় ও বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান—এই চার ধরনের উত্পাদন ব্যবস্থার অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে অধিকাংশ মানুষই সরকারি প্রতিষ্ঠান বলে থাকেন, যা মোটেও ঠিক নয়। কারণ সরকারের কোনো নিজস্ব সম্পদ নেই। সরকার জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের আমানতদারি করে মাত্র। রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে চারটি আবশ্যিক উপকরণ দরকার হয় (নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সার্বভৌমত্ব এবং সরকার) তার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল এবং একমাত্র পরিবর্তনশীল উপকরণ হচ্ছে সরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য তিন ধরনের প্রতিষ্ঠান সরাসরি মালিক কর্তৃক পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে কখনোই তেমন কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয় না। সেখানে সর্বোচ্চ মাত্রায় সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব প্রকাশ্যেই পরিলক্ষিত হয়। বিশ্বের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ এটা মেনে নিয়েছেন যে, সরকার কখনোই ভালো ব্যবসায়ী বা উত্পাদক হতে পারেন না। সরকার কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গেলে সেখানে দুর্নীতি হবেই। সরকার শুধু উত্পাদনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবেন, আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো উত্পাদন কার্য পরিচালনা করবে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের ‘রোল মডেল’-এ পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালে জাতিসংঘের রেটিং অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এটাই সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অর্জন বা স্বীকৃতি। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উঠে আসবে। ইতিপূর্বে বিশ্বব্যাংকের রেটিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। এসব অর্জনের পেছনে মূলত ভূমিকা রেখেছে ব্যক্তিমালিকানাধীন উত্পাদন খাতগুলো। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে তাদের কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারেনি। পণ্য ও সেবা রপ্তানি থেকে শুরু করে জনশক্তি রপ্তানি, কৃষি ও শিল্প উত্পাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন উত্পাদন সেক্টর যখন লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দিনের পর দিন বিস্ময়করভাবে লোকসান দিয়ে চলেছে। রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ভর্তুকি দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লোকসান দেওয়ার মূল কারণ হচ্ছে এদের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব, ব্যাপক দুর্নীতি এবং নানা ধরনের অনিয়ম। কিন্তু বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে লোকসান দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ নেই। তাই নতুন করে ভাবতে হবে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা যেতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে তোলা একেবারেই সম্ভব নয়, শুধু সেসব প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে। যে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকবে তাদের পরিচালনার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন চাকরির সুবাদে অভ্যন্তরীণ সুশাসন এবং দুর্নীতি বিষয়ে যে অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি অর্জিত হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করার কিছু প্রস্তাবনা করতে চাই। এসব প্রস্তাবনা বিবেচনা করা হলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সুশাসন অনেকটাই নিশ্চিত করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাকরি পেলে তিনি মারাত্মক কোনো অপরাধের কারণে চাকরিচ্যুত না হলে অব্যাহতভাবে ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। এই সিস্টেমের পরিবর্তে মেয়াদভিত্তিক নিয়োগদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন, একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী তিন বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এই তিন বছর যদি তিনি সততার সঙ্গে সন্তোষজনকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তাহলে তার চাকরির মেয়াদ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, প্রচলিত পদ্ধতিতে ‘দুর্নীতির সঙ্গে দুর্ভাগ্য’ যুক্ত না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ চাকরিচ্যুত হন না। এন্ট্রি লেভেলের কর্মকর্তা, বিশেষ করে অফিসার পর্যায়ের কর্মকর্তা যারা পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা হবেন তাদের নিয়োগদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসীন হলেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে একশ্রেণির কর্মকর্তা বিভিন্ন ব্যানারে সরকার দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে থাকেন। এটা বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে এজন্য নতুন কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। যারা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবেন তাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ থাকবে না। যে দলই সরকার গঠন করুন না কেন, তারা সেই সরকারের নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নে ব্যাপৃত থাকবেন। অনেক প্রতিষ্ঠানেই দেখা যায় চার/পাঁচটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকে। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সিবিএর বাইরে এত বেশিসংখ্যক ট্রেড ইউনিয়ন থাকার যৌক্তিকতা বিবেচনা করা যেতে পারে।
নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডে নতুন পরিচালক নিয়োগ দিয়ে থাকে। সরকার তার পছন্দের লোককে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিয়োগ দিতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে একজন পরিচালকের ব্যক্তিগত সততা, দক্ষতা ও বিচক্ষণতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মনোপলি বিজনেস বন্ধ করতে হবে। মনোপলি বিজনেস দুর্নীতির জন্ম দেয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতেও সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানে গড়ে তোলার অনুমতি দিতে হবে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন (এসিআর) দেওয়ার বিধান রয়েছে। সাধারণত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা তার নিচের লেভেলের কর্মকর্তার এসিআর লিখে থাকেন। কিন্তু অধীন কর্মকর্তা তার ওপরের পর্যায়ের কর্মকর্তার সম্পর্কে কোনো রিপোর্ট সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে দিতে পারেন না। এতে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা তার অধীন কর্মকর্তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারেন এবং স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ পান। এ অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য অধীন কর্মকর্তাকেও তার ঊর্ধ্বতন বা নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা, সততা, দায়িত্বশীলতা ইত্যাদি বিষয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন লেখার সুযোগ দিতে হবে। প্রত্যেক কর্মকর্তা তার অভিজ্ঞতার আলোকে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করবেন, এটাই রীতি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ তাদের বুদ্ধি-বিবেচনা মতো নোট লিখতে পারেন না। ওপরের কর্মকর্তা যেভাবে নোট লিখতে বলেন, তাকে সেভাবেই লিখতে হয়। অথচ প্রস্তাবের পুরো দায়দায়িত্ব নোট উপস্থাপনকারীর ওপরই বর্তায়। দেখা যায়, কেরানি যে প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন ওপরের পর্যায়ের সব কর্মকর্তা তাতে সহমত প্রকাশ করেন। একবার উইলিয়াম বেন্টিংক নাকি বলেছিলেন, কেরানির নোটেই যদি ওপরের সব কর্মকর্তা সহমত প্রকাশ করেন তাহলে অফিসে কেরানি এবং শীর্ষ বস থাকলেই তো চলে। অন্য কর্মকর্তাদের কী প্রয়োজন? পাঁচ-ছয় জন কর্মকর্তার প্রত্যেকে যদি তাদের নিজ নিজ বিবেচনা মোতাবেক নোট উপস্থাপন করার সুযোগ পেতেন তাহলে শীর্ষ কর্মকর্তার পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হতো। প্রতিটি অফিসের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি করে বিভাগ চালু করা যেতে পারে। এই বিভাগের কাজ হবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
