একসময় সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হওয়ায় সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রমের ব্যয় মিটে যেত। ফলে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের প্রয়োজন হতো না। তবে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ধারা একইরকম থাকলেও ব্যাংকিং খাত থেকে ধার করছে সরকার। গত অর্থবছর থেকে এ প্রবণতা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, চলতি মাসের ৬ তারিখ পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৬৮ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের শেষদিন ৩০ জুনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে সরকারের ঋণ স্থিতি ছিল ৬৪ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। অর্থাত্ গত ছয় মাসে বেড়েছে চার হাজার ১৪২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জুন শেষে সরকারের ঋণ স্থিতি ছিল ২৩ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। গত ছয় মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে আট হাজার ৪১২ কোটি টাকা ধারা করেছে সরকার। সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের কাছে এখন সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা।
এদিকে ক্রমেই বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ। চলতি অর্থবছরের (জুলাই-নভেম্বর) প্রথম পাঁচ মাসে ২১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। যা চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মোট লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। মূলত, ব্যাংকের আমানতের সুদের চেয়ে দ্বিগুণ মুনাফা মিলছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে। একারণেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে। তবে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি হওয়ায় সরকারের দায়ও বাড়ছে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতদিন সরকারের বাজেট ঘাটতির বড় অংশই জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে জোগান হচ্ছিল। ফলে সরকারকে আর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার দরকার হচ্ছিল না। সঞ্চয়পত্রে সরকারকে সুদ বাবদ দ্বিগুণ ব্যয় করতে হবে। এতে ভবিষ্যতে সরকারের উপর চাপ বাড়বে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের দায়ও সরকারের উপর চাপ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
ব্যাংকাররা বলছেন, বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তারল্য সংকটে পড়েছে বেশিরভাগ ব্যাংক। এ সংকটের কারণে সুদহার হুহু করে বাড়তে থাকে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বাড়তে থাকা সুদহারে লাগাম টানেন ব্যাংকের মালিকরা। গত জুলাই মাস থেকে আমানতে সর্বোচ্চ ৬ এবং ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও এখনো অনেক ব্যাংক সে নির্দেশনা মানছে না।
সুদহার কমালে ঋণের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়ে তারল্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে বলে তাদের ধারণা। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে তারল্য সংকট তৈরি হতে পারে। এই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ব্যাংকগুলোর ফান্ড ম্যানেজমেন্টের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অবশ্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অর্থ ছাড় করতে সময় লাগে, দৈনন্দিন কাজে অর্থের প্রয়োজন হয়; কিন্তু শুরুতেই আয় হয় না। তাই সবসময় অর্থবছরের শুরুর দিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ে। বিভিন্ন প্রকল্প ও বরাদ্দের অর্থ পাওয়ার পর সেখান থেকে প্রয়োজন মেটানো ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা হয়, যার ফলে শুরুতে বাড়লেও পরবর্তী সময়ে তা কমে যায়। তারা জানান, মূলত বড় বড় প্রকল্প যেমন পদ্মা সেতু, এলএনজি টার্মিনাল, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অগ্রগতির ফলে সরকারের প্রচুর নগদ অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।
ব্যাংক থেকে পুরো অর্থবছরে কত টাকা ঋণ নেওয়া হবে সে বিষয়ে বাজেটে উল্লেখ থাকে। সাধারণত, প্রতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে কমবেশি ঋণ নিয়ে আসছে। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে কোন টাকা ঋণ নেয়নি সরকার। ওই অর্থবছরে উল্টো বকেয়া পরিশোধ করেছিল। মূলত, সঞ্চয়পত্র থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্থের যোগান আসায় ব্যাংক থেকে সেবছর ঋণ নেয়নি সরকার।
