দুই যুগের স্বপ্ন দুই ঘণ্টায় ছাই

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২০, ০৯:০৭

কিশোর বয়সে কল্যাণপুর নতুন বাজার বস্তিতে এসেছিলেন রাসেল মিয়া। এরপর পেরিয়ে গেছে দুই যুগেরও বেশি সময়। এরই মধ্যে তিনি বিয়ে করেছেন। আছে সন্তানও। বস্তিরই একটি ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। পাশের আরো চারটি ঘরে তার মা, ভাইবোনদের বসবাস। তার সামনেই ধারদেনা করে একটি ফার্নিচারের দোকান গড়েছেন, যা তার আয়ের একমাত্র উত্স।

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসার আর আয়ের পথ মাত্র দুই ঘণ্টায় পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। প্রাণ রক্ষা পেলেও আগুনের হাত থেকে রক্ষা হয়নি ঘর বা দোকানের কোনো মালামাল।

গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে কল্যাণপুর এলাকার নতুন বাজার বস্তিতে আগুন লাগে। আগুনের খবরে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট পাঠানো হয়। ভয়াবহতা বাড়তে থাকায় একে একে মোট ১৩টি ইউনিট সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণে পাঠানো হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় দুই জন মারাত্মক আহত হয়েছেন। তারা বর্তমানে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিত্সাধীন আছেন। তাদের দুই জনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। এই অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব হয়েছে প্রায় অর্ধশত পরিবার। তাদের দিন কীভাবে যাবে, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছে এসব পরিবার।

ছাইভস্ম হাতে রাসেল বলেন, ‘অনেক কষ্টের সংসার ভাই। সেই ছোট আসছিলাম। অনেক কষ্ট কইরা কিছু টাকা জমাইছিলাম। একটা দোকান দিছিলাম। সব শেষ।’ আগুন তার ঘরের পাশ থেকেই ধরেছে বলে জানান তিনি। 

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমার ঘরের পাশের ভাঙারির দোকানে একটা প্রেশার মেশিন আছে। হঠাত্ ঐখানে একটা আওয়াজ হইল। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধইরা গেল। তখন যদি ঘরের মাল বের করতে যাই, তাইলে আর পোলাপান বাঁচাইতে পারতাম না। পোলাপানগুলোরে কোনোভাবে বাইর করছি। তা-ও আমার বাচ্চার পা একটু পুড়ে গেছে।’ 

রাসেল ও তার স্ত্রীর ভাষ্য, একটি সমিতি থেকে ব্যবসার জন্য ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তারা। টাকা ছিল ঘরের আলমারিতে। আগুনে ছাই হয়ে গেছে সেই টাকা। পুড়েছে ঘরে থাকা গহনা, দামি মালামাল।

শুধু রাসেলের নয়, আগুনে প্রায় ৪০টি ঘর পুড়েছে এই বস্তিতে, যার মধ্যে ৯টি দোকান। এর মধ্যে পুরোনো ফার্নিচারের দোকান ছিল রাসেল ও কর্নি মিজানের। আর নতুন ফার্নিচার বিক্রি করতেন ফিরোজ। খড়ির দোকান ছিল রাশেদ ও কহিনূরের। আর ভাঙারির দোকান ছিল লিটন, ইউনুস, নান্নু মোড়ল, ফরিদ ও মোস্তফার। আড়াই যুগ ধরে এই বস্তিতে ভাঙারির ব্যবসা করে আসছিলেন লিটন। আগুনের সময় দোকান থেকে কিছুই বের করতে পারেননি তিনি। টাকায় কেনা মালামাল চোখের সামনে পুড়ে গেছে। এখন পড়ে আছে শুধু কয়লা। 

লিটন বলেন, ‘আগুন এর আগেও এই বস্তিতে লাগছে। কিন্তু এত বড় আগুন লাগে নাই। এইবার কিছুই বাঁচাইতে পারি নাই।’

এদিকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য গভীর দুঃখ ও সমবেদনা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। 

রাতেই ডিএনসিসির প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা এ এস এম মামুন জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে মেয়র আতিকুল ইসলামের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া তার পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/জেডএইচ