যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিভক্তির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিলেন মার্কিনিরা। গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সময় ভোর ৫টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪টায়) ভোট গ্রহণ শুরু হয়। আর শেষ হয় স্থানীয় সময় রাতে, অর্থাত্ বাংলাদেশ সময় আজ ভোরে। করোনা মহামারির কারণে এবার রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ১০ কোটি আগাম ভোট পড়েছে। সব মিলিয়ে এক শতকের বেশি সময় পর এবারই সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রিপাবলিকান প্রার্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থাকছেন, নাকি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন, সেটা নির্ধারিত হবে এই ভোটেই।
গতকাল নির্বাচনের দিন পর্যন্ত জরিপে এগিয়ে ছিলেন বাইডেন। সিএনএনের জরিপে বলা হয়েছে, বাইডেনের পক্ষে ৫২ শতাংশ এবং ট্রাম্পের পক্ষে ৪২ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে। এই জরিপের মাধ্যমে পপুলার ভোট বা জনগণের ভোটের একটি ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ব্যতিক্রমী ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পদ্ধতির কারণে সব হিসাব-নিকাশ আটকে রয়েছে কয়েকটি সুইং স্টেটে। বেশির ভাগ সুইং স্টেটেও এগিয়ে রয়েছেন বাইডেন। তবে এসব রাজ্যে দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান অনেক কম। এ কারণে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবেন সেটা বলতে পারছেন না পর্যবেক্ষকেরা।
এদিকে একেক রাজ্যে ভোট গ্রহণের সময় ও গণনার নিয়ম ভিন্ন হওয়ায় আজই নির্বাচনের ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ভোট গ্রহণ শেষে কয়েকটি রাজ্যের প্রাথমিক ফলাফলে কে বিজয়ী হচ্ছেন সেটার আভাস মিলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরাজয় মেনে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি না দেওয়ায় এবং ফল গণনা নিয়ে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ছে। ইতিমধ্যে অনেক দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। হোয়াইট হাউজ ঘিরে নিরাপত্তা বেড়া তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচনি রাতে ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার প্লাজা এবং হোয়াইট হাউজের কাছের একটি পার্কে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় যে কোনো সহিংসতা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অন্যদিকে নির্বাচনের ফল মেনে না নেওয়ার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই জন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল। নেতারা যাতে সহিংসতায় উসকানি না দেন বা সমর্থন না করেন, সেজন্য আহ্বান জানিয়েছেন তারা। খবর সিএনএন ও বিবিসির।
এগিয়ে রয়েছেন জো বাইডেন
প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হতে যে কোনো প্রার্থীর ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট লাগবে। যুক্তরাষ্ট্রে মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। ওয়াশিংটন ডিসির ৩ জনসহ ৪৩৮ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (নিম্নকক্ষ) এবং ১০০ জন সিনেটর (উচ্চকক্ষ) মিলে ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা করা হয়। মেইন ও নেব্রাস্কা রাজ্য ছাড়া ৪৮টি রাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে যিনি যে রাজ্যে সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পাবেন, তিনি ঐ রাজ্যের সব ইলেকটোরাল ভোট পাবেন। নেব্রাস্কা ও মেইন রাজ্যের পপুলার ভোটের বিজয়ীরা পান দুটি করে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট।
সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, জাতীয় পর্যায়ে জরিপে এগিয়ে বাইডেন। তার জয় নিশ্চিত এমন রাজ্যগুলোতে ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে ২০৩টি। আর ট্রাম্প জিততে যাচ্ছেন এমন রাজ্যগুলোর ইলেকটোরাল ভোট ১২৫টি। বাকি ২১০টি ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে সুইং স্টেটগুলোতে। এর মধ্যে রিপাবলিকানদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস রয়েছে। এই রাজ্যে ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৩৮। গতবার ট্রাম্প এই রাজ্যে অনায়াসে জিতেছিলেন। কিন্তু এবার সবচেয়ে আগাম ভোট পড়েছে এই টেক্সাসে। এ কারণে এই রাজ্যে ট্রাম্প হারতে পারেন বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। কারণ ডেমোক্র্যাটরাই এবার সবচেয়ে বেশি আগাম ভোট দিচ্ছেন। এই রাজ্যে জিতলে বেগ পেতে হবে না বাইডেনকে। আর ঘুরে দাঁড়াতে কষ্ট হবে ট্রাম্পের।
গতবার মিশিগান, উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়া ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এবার জরিপে এসব রাজ্যে বড় ব্যবধানে এগিয়ে বাইডেন। এসব রাজ্যে জয় পেলে সহজেই প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন বাইডেন। সেক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট হতে হলে ট্রাম্পকে অবশ্যই জরিপে পিছিয়ে থাকা বেশির ভাগ সুইং রাজ্যে জয় পেতেই হবে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে সেটাই হয়েছিল।
ভোটগ্রহণের পর অন্যান্য বারের মতো আজই ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। মার্কিন গণমাধ্যমগুলো বলছে, নির্বাচনের সব ভোট গণনা হতে সব মিলিয়ে বেশ কয়েক দিন লেগে যেতে পারে। তবে কে বিজয়ী হতে যাচ্ছে, সেটা আভাস মিলতে পারে আজই।
জয়ের অপেক্ষায় ট্রাম্প, নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি বাইডেনের
নির্বাচনের আগের দিন সোমবার চারটি অঙ্গরাজ্যে প্রচারণা চালান ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসব প্রচারণায় তিনি জো বাইডেনের সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে আরেকটি সুন্দর জয়ের আশা ব্যক্ত করেন। গতকাল নির্বাচনের দিন তিনি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, চার বছর আগের চেয়ে বড় জয় পেতে চলেছেন। টুইট করে সবাইকে ভোট দিতে বলেন ট্রাম্প। ভোটের রাতে তিনি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স হোয়াইট হাউজে থাকবেন। রাতে তিনি সমর্থকদের নিয়ে নৈশভোজের আয়োজন করেছেন।
অন্যদিকে সোমবার দুইটি অঙ্গরাজ্যে প্রচারণা চালান জো বাইডেন। প্রচারণায় তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবকিছু গুছিয়ে হোয়াইট হাউজ ছাড়ার সময় হয়েছে। এ সময় নতুন দিন শুরুর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। গতকাল নির্বাচনের দিন সকালে নিজ রাজ্য ডেলাওয়ারের একটি গির্জায় যান বাইডেন। সেখানে ছেলের সমাধিস্থলেও যান তিনি। এরপর শেষবারের মতো ভোটারদের প্রতি আবেদন জানাতে অন্যতম সুইং স্টেট পেনসিলভেনিয়া যান বাইডেন। তিনি এবং তার রানিংমেট কমলা হ্যারিস ডেলাওয়ারে থেকেই ভোটের ফলের অপেক্ষা করবেন।
ফল না মানার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি সাবেক দুই অ্যাটর্নির
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ফল না মানার ঘোষণা দিয়েছেন। তার এই ঘোষণায় নির্বাচন পরবর্তী সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোটের ফল মেনে না নেওয়ার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই জন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল। তারা হলেন—প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডার এবং জর্জ ডাব্লিউ বুশের আমলের অ্যাটর্নি জেনারেল মাইকেল মাকাসি।
ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক লেখায় তারা বলেছেন, দুই জনের মধ্যে আইন এবং নানা নীতিনির্ধারণী বিষয়ে অতীতে অনেক মতপার্থক্য ছিল। এখনো আছে। কিন্তু আজ আমরা একসঙ্গে লিখছি, কারণ আমরা অতীতে যেভাবে একে-অন্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছি, এখনো তা করে যেতে চাই, যেভাবে অতীতে আমেরিকানরা করেছেন। তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে জনগণকে তাদের মত প্রকাশের জন্য বিক্ষোভের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা যে রাজনৈতিক ফল আশা করেন, সেই ফল না পেলে অন্য নাগরিকদের শান্তি কেড়ে নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
