গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের সংশোধিত মজুরি ঘোষণার পরও এ খাতের শ্রম অসন্তোষ শেষ হয়নি। কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে মালিকপক্ষের হুঁশিয়ারির পরও গতকাল সোমবার আশুলিয়া ও গাজীপুরে প্রায় ৩৫টি কারখানায় শ্রম অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে। এ তালিকায় বেশকিছু বড় গার্মেন্টসও রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ওইসব এলাকায় কিছু কারখানা ছুটি দিয়েছে। তবে গতকাল সোমবার আগের দিনগুলোর তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল আশুলিয়া ও গাজীপুর এলাকার কারখানা মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র নেতারা। রাজধানীর বিজিএমইএ ভবনের অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবারও কারখানা মালিকরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এর পর শ্রমিকরা কাজ না করলে কিংবা কোন অসন্তোষ করলে বিদ্যমান শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই ধারা অনুযায়ী, যতদিন কারখানা বন্ধ থাকবে, ওই সময়ের জন্য শ্রমিকরা কোন পাওনা পাবে না।
এদিকে সংশোধিত মজুরি নিয়ে শ্রমিকপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের মধ্যে একটি অংশ এটিকে সাধুবাদ জানালেও কেউ কেউ বলছেন, এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আসবে না। গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, পনের, বিশ, একশত টাকা বাড়িয়ে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন হবে - এটা মনে করা অবিবেচনাপ্রসূত।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গতকাল বিকেলে বিজিএমইএতে ওইসব এলাকার কারখানা মালিকরা বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি এস এম মান্নান কচি ইত্তেফাককে বলেন, ওইসব এলাকার কারখানা মালিকরা কারখানা বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন। তবে সেখানকার স্থানীয়দের অনুরোধে আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এর পর কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এফবিসিসিআই সভাপতি ও গার্মেন্টস উদ্যোক্তা সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনও বলেন, মঙ্গলবারের পর যেখানেই গন্ডগোল হবে, সাথে সাথে ওই কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
রবিবার সরকার মজুরি কাঠামো সংশোধন সাতটি গ্রেডের মধ্যে ৬টিতে বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ৬ নম্বর গ্রেডে মোট মজুরি বেড়েছে ১৫ টাকা, ৫ম গ্রেডে ২০টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ১০২ টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ২৫৫ টাকা। এই গ্রেডগুলো মূলত শ্রমিকদের জন্য। এর বাইরে অফিসিয়াল কর্মকর্তাদের দুটি গ্রেড দু্ই ও এক নম্বরে বেতন বেড়েছে যথাক্রমে ৭৮৬ ও ৭৪৭ টাকা। মজুরি বৃদ্ধির এই এই সিদ্ধান্তকে মন্দের ভালো হিসেবে দেখছেন ত্রিপক্ষীয় পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ও ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপন। গতকাল ইত্তেফাক তিনি বলেন, এর আগে গেজেট প্রকাশের ১৪ দিনের মাথায় আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম। তবে একটা গেজেট হয়ে যাওয়ার পর কতটাই আর বাড়ানো সম্ভব। সার্বিকভাবে বর্তমান মজুরিকে খুব খারাপ বলা যাবে না। তবে গতকাল গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পুনঃনির্ধারিত মজুরি ঘোষিত হওয়ার ফলে শ্রমিকদের আশাভঙ্গ হয়েছে। মূলত ৬, ৫, ৪, ৩ নং গ্রেডের মজুরি হার নিয়ে সংকট। রবিবার ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামোতে এই গ্রেডগুলোতে যথাক্রমে ১৫ টাকা, ২০ টাকা, ১০২ টাকা, ২৫৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। চলমান শ্রমিক অসন্তোষ পনের, বিশ, একশত টাকা দিয়ে নিরসন হবে এটা মনে করা অবিবেচনাপ্রসূত।
এদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র ঢাকা অফিস গতকাল এক বিবৃতিতে গার্মেন্টস খাতের মজুরি সংক্রান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে একটি তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে শক্তিশালী মজুরি নীতিমালা করার আহ্বান জানিয়েছে। এ লক্ষ্যে সামাজিক সংলাপকে গুরুত্ব দিয়েছে।
‘নো ওয়ার্ক নো পে’ :মাইকিং করে শ্রমিকদের পুলিশ
ইত্তেফাকের সাভার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল সোমবারও আশুলিয়ার বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা চালায় শ্রমিকরা। এসময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে ছিল। পরে অধিকাংশ শ্রমিকই কাজে যোগদান করে।
গতকাল বিকেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক মত বিনিময় সভার আয়োজন করে। সভায় ঢাকা জেলার পুলিশ শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, মঙ্গলবার থেকে জামগড়া এলাকায় মাইকিং করতে হবে, যারা কার্ড পাঞ্চ করে চলে যাবেন তাদেরকে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ পদ্ধতিতে কোন বেতন পাবেন না বলে জানিয়ে দিতে হবে।
ইত্তেফাকের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান গাজীপুর মহানগরীর একটি গার্মেন্টে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করেছে বহিরাগত শ্রমিকরা।
