যত্রতত্র আবাসিক ভবন আর অপরিকল্পিত পর্যটননগরী ছিল কক্সবাজার। পর্যটনকে প্রাধান্য না দিয়ে, নিয়মনীতির তোয়ক্কা না করেই গড়ে তোলা হয়েছিল বিভিন্ন অপরিকল্পিত ভবন। এ অবস্থায় সরকার আধুনিক ও আকর্ষণীয় পর্যটননগরী গড়তে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। পর্যটননগরী গড়তে সংস্থাটিকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ক্ষমতা। এখন কোনো ভবন নির্মাণ করতে গেলে নকশা পাশ করাতে হয়। নকশাবহির্ভূত ২৭টি ভবনের অংশ ভেঙে দিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া ২২৯টি ভবনকে উচ্ছেদের নোটিশও পাঠানো হয়েছে। ভবন সম্পর্কিত বিষয় ছাড়াও আধুনিক পর্যটননগরী গড়তে বিভিন্ন প্রকল্পও শুরু করেছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
ভাস্কর্য নির্মাণ, ঐতিহ্যবাহী পুকুরের সৌন্দর্যবর্ধন, যানজট নিরসন, সমুদ্রতীরে সবুজায়ন, আবাসন সমস্যার সমাধানের জন্য নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। এর মধ্যে হলিডে মোড় থেকে খুরুশকুল রাস্তার মাথা পর্যন্ত সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এটি উদ্বোধন করেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ। ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্পে নির্মাণ হবে ওয়াকওয়ে, সাইকেলওয়ে, সবুজায়ন, ফুটওভার ব্রিজ, সড়কবাতি স্থাপন (বিদ্যুতায়ন), ফুটপাত ও ড্রেন নির্মাণ, সিসি ক্যামেরা, ওয়াইফাই সংযোগ, স্যুভিনির শপ প্রভৃতি।
এছাড়া রয়েছে বাঁকখালী নদীসংলগ্ন ১৫০ ফুট প্রশস্থ সবুজ বেষ্টনীসহকারে বিকল্প সড়ক উন্নয়ন, কালুর দোকান থেকে লাইটহাউজ পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ। এছাড়া কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ৬৯০ দশমিক ৬৭ বর্গকিলোমিটার নির্ধারণ করে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অন্যদিকে পর্যটননগরী কক্সবাজারের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কক্সবাজারের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘি, গোলদীঘি ও বাজারঘাটা পুকুরগুলোর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে; যেগুলোতে পাড় বাঁধানো, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বসার স্থান, আলোকসজ্জা, সবুজ বেষ্টনী, স্ন্যাকস বারসহ পর্যটকবান্ধক পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে পর্যটকসহ স্থানীয় জনসাধারণের বিনোদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে সেখানে। এছাড়া সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ শহরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চারটি ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে। স্থাপন করা হয়েছে বিভিন্ন টেরাকোটা। সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের ছাত্রদের গণ-আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা দাবি, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম। আবাসন সমস্যার নিরসনে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে মনোরম পরিবেশে আবাসন প্রকল্প। যেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বিভিন্ন সাইজের ৩৫১টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। এছাড়া সংস্থাটির একটি বহুতল অফিস নির্মাণের কাজ চলছে। কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সবুজায়নের জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাল কাঁকড়া, সাগরলতা, কচ্ছপ, ডলফিনসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পাঁচটি স্থানে ঘেরাবেড়া দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া সবুজায়নের জন্য মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেক থেকে টেকনাফ, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী বিচ এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় ১ লক্ষ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)-এর চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা পর্যটননগরীকে ঢেলে সাজাতে কাজ করছি। বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি আমরা। এর মধ্যে কিছু প্রকল্পের কাজ চলছে, আবার কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। একটি মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে পর্যটননগরীর চিত্র পালটে দিতে চাই। প্রধানমন্ত্রী নিজে আমাদের এ ব্যাপারে সহযোগিতা করছেন।’
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব মো. শহিদ উল্লা খন্দকার বলেন, কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটননগরী হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় থেকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। পুরো কক্সবাজার ঘিরে আমাদের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা পরিকল্পিত একটি পর্যটন নগরীর রূপ দিতে পারব।
