এক উপজেলার ভেতরে অন্য উপজেলার পাঁচ গ্রাম!

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২০, ২১:৪৯

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ বসবাস করছে পার্শ্ববর্তী নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ভেতরে। বাংলাদেশের ভেতরে এ যেন আরেক ছিটমহল! সরজমিনে ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে জানা যায়, বৃটিশ আমলে শিরিষ চন্দ্র ও সতিশ চন্দ্র নামে দুই মহারাজা উলিপুর ও নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দে জোতদারি চালাতেন। তাদের জোতদারি এলাকার সীমানায় বসবাসকারীদের সেভাবেই তাদের খাজনা দিতে হতো। ভারত ভাগ ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও জোতদারদের রেখে যাওয়া সীমানা জটিলতার কারণে ভোগান্তিতে পড়ে যান এই এলাকার পাঁচ গ্রামের মানুষ। ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরবর্তীকালে নাগেশ্বরী উপজেলার মধ্যে পড়ে যায়। অপরদিকে ভিতরবন্দ ইউনিয়নের অভ্যন্তরে বসবাসরত পাঁচ গ্রামের মানুষ উলিপুরের মহারাজার অধীনে থাকায় তারা পরবর্তীকালে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের ভোটার হয়ে যান। সৃষ্টি হয় ছিটমহলগুলোর মতো তাদের অবস্থা। ঐ এলাকার কৈকুড়ি গ্রামের আহম্মেদ হোসেন (৮৫) জানান, আমরা সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের মানুষ বসবাস করছি পার্শ্ববর্তী নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ভেতরে। এখানে মোট ৬ শতাধিক খানায় প্রায় সোয়া ৩ হাজার মানুষ বৃটিশ আমল থেকে আরেক উপজেলার ইউনিয়নে বসবাস করছি। ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ৮০০। বন্যা হলেই আমাদেরকে ভিতরবন্দে আশ্রয় নিতে হয়। সাহায্য সহযোগিতা তারাই করেন। কিন্তু আমরা বাসিন্দা আরেক ইউনিয়নের। এসব এলাকার মানুষের লেখাপাড়া, বিয়ে-শাদী, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিচার-সালিশ, বন্যায় আশ্রয় গ্রহণ সবকিছুই করতে হয় ভিতরবন্দে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে তাদের ইউনিয়ন ভোগডাঙ্গা। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত বেশির ভাগ মানুষ। মাঝখানে বিলের ছড়া দিয়ে বিচ্ছিন্ন এ এলাকার রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে রোগী পরিবহনসহ যাতায়াত সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব গ্রামের মানুষ উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিবর্তন করে বর্তমান অবস্থান নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দের বাসিন্দা হতে চান।

এই গ্রামের কাশেম, ছামসুল ও ছামিনা বেগম জানান, চারদিকে ভিতরবন্দ আর আমরা তার ভেতরে বসবাস করছি। এখান থেকে ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নে যেতে হলে ভিতরবন্দ পার হয়ে আমাদেরকে যেতে হয়। আমাদের অবস্থা ছিটমহলের মানুষের মতো। আমরা যেহেতু ভিতরবন্দের ভেতরে আছি, এখন আমরা এখানেই থাকতে চাই। ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইদুর ইসলাম জানান, এখনো অনেকে মোবাইল করে আমাকে জানায় ভিতরবন্দ ইউনিয়নে তারা থাকবে না। আমরা ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নে দেশ স্বাধীনের আগে থেকে আছি, এখনো এই ইউনিয়নে থাকতে চাই। ভিতরবন্দ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল হক খন্দকার জানান, তার ইউনিয়ন পরিষদের কাছেই গ্রামগুলোর অবস্থান হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন সময়ে এই পাঁচ গ্রামের মানুষকে আশ্রয় দেওয়াসহ বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে অ্যাডভোকেট এস এম আব্রাহাম লিংকন জানান, ভৌগোলিক অবকাঠামো জনগণের কল্যাণ্যের জন্য। এটা একটা স্বাধীন দেশের মধ্যে ছিটমহলের মতো অস্তিত্ব। তারা যে উপজেলায় রয়েছে সেখানে এডজাস্ট করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করা উচিত। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে প্রথম জানতে পারলাম। দুই উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য পনির উদ্দিন আহমেদ জানান, মানুষগুলো খুবই দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। জটিলতা কাটাতে স্থানীয় জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের সদিচ্ছার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।