আনোয়ারা সৈয়দ হক :নরকের ফুল

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৯

মনি হায়দার

আনোয়ারা সৈয়দ হক একজন মানুষ, কিন্তু অনেকগুলো ডানা বিস্তার করে আছেন বাংলা সাহিত্যে। আমরা জানি, আনোয়ারা সৈয়দ হক কথাসাহিত্যিক। কিন্তু তিনি কেবল কথাসাহিত্যর জগতে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, ছড়িয়ে দিয়েছেন সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গেও। গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে লিখে চলেছেন কবিতা, ভাষ্য, কলাম ও ছড়া। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তিনি কথাসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন পাঠকদের কাছে। আরো আছে—আনোয়ারা সৈয়দ হক ডাক্তার, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অনেক বছর অধ্যাপনাও করেছেন। জন্মেছেন ১৯৪০ সালের ৫ নভেম্বর যশোর শহরের চুড়িপট্টিতে, যেখানের পরিবেশ ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশের অন্তরায়। পিতা ছিলেন অনেকটা খামখেয়ালি। আত্মকেন্দ্রিক। কিন্তু মা ছিলেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবল অনুরাগী। শৈশবে চুড়িপট্টির সেই দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আনোয়ারা চেতনের গভীরে গ্রন্থিত করেছিলেন সব বাধার প্রাচীর ভেঙে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবেন। মায়ের একান্ত অনুপ্রেরণায় চুড়িপট্টির মোহানগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর মধুসূদন তারাপ্রসন্ন উচ্চবিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন এবং ১৯৫৮ সালে মাইকেল মধুসূদন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে আইএসসি পাশ করেন। আনোয়ারা সৈয়দ হকের জীবনের দরজা খুলে যায় আইএসসি পাশ করার মধ্য দিয়ে। তিনি যশোরের সীমানার বাইরে, বৃহত্তর জীবনের মহাসড়কে পা রাখার সুযোগ পেলেন। ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেন। অবশ্য আগেই আনোয়ারার বেশ কয়েকটা লেখা রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকের কচিকাঁচার পাতাসহ অন্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।   লেখার সূত্র আর ডাক্তারি পড়ার আগ্রহে সেই সময়ে পূর্ব বাংলার কেন্দ্রভূমি ঢাকায় এলেন। ভর্তি হলেন ঢাকা মেডিক্যালে। থাকতেন হলে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, যশোরের ঐ অঞ্চল থেকে একমাত্র আনোয়ারা বেগমই প্রথম মেয়ে, যিনি ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হলেন। বলা যায়, নিজেকে কক্ষপথে রাখার প্রথম পদক্ষেপ ছিল ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হওয়া। পড়ার মধ্যেই লিখছেন তিনি। ছাপাও হচ্ছে কোথাও কোথাও। এই সময়ে তিনি বন্ধুর রুমে ঈদসংখ্যার পুরোনো পত্রিকায় পড়লেন তরুণ কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের একটি গল্প ‘তিন পয়সার জোছনা’।

এই গল্প পড়ার নিট ফলাফলে আনোয়ারা বেগম পরিণত হলেন আনোয়ারা সৈয়দ হকে। গল্পটা পড়ে এত ভালো লাগে আনোয়ারার, তিনি ঠিকুজি বের করলেন সৈয়দ হকের। সৈয়দ হক চাকরি করতেন এস এম পারভেজের সিনে পত্রিকা চিত্রালীতে। সেই ঠিকানায় চিঠি পাঠালেন আনোয়ারা বেগম। শিগিগরই উত্তর পেলেন। ছয় মাস চলল চিঠির যোগাযোগ। দুজনের মধ্যে গড়ে উঠতে শুরু করল সম্পর্কের সেতু। দুজনের দেখা হলো গুলিস্তানের চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। আনোয়ারার বন্ধুরা খুব সাহায্য করেছিলেন সেই সময়। সময় ও সম্পর্কের সেতুতে যে সংসার গড়ে উঠেছিল দুজন লেখকের, বাংলা সাহিত্য তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যেও বিরল। দুজনে লিখছেন একই বাড়িতে, আলাদা রুমে। কেউ কারো ব্যক্তিগত লেখা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতেন না। নিজের সাধনায় মগ্ন থেকে, সংসারের সব দায়িত্ব পালন করে আনোয়ারা সৈয়দ হক সাহিত্যের জগতে নিজের প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন, যা বিরল ঘটনা।

আগেই লিখেছি, আনোয়ারা সৈয়দ হকের বইয়ের তালিকা দীর্ঘ। সেই সব বইয়ের তালিকা থেকে ‘অন্ধকারে হে দরোজা’ বইয়ের অন্ধকারে হে দরজা সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত। গল্পটা  শুরু করেন তিনি কয়েক জন বন্ধুর রেস্টুরেন্টে আড্ডার মধ্য দিয়ে। শাহজাহান, কামাল, শাহেদ, মাহমুদ...; যে যার মতো কবিতা পড়ছে, চা খাচ্ছে, সিগারেট জ্বালাচ্ছে আবার একে অপরের সঙ্গে লাগছে। বন্ধুদের মধ্যে শাহজাহান অন্যমনস্ক। ওর শরীরে জ্বর। এসেছে শৈলকুপা থেকে ঢাকায় জীবনের চাকা ঘোরাতে। গ্রামের বাড়িতে ফ্যাকাসে মা-বাবা, ভাইবোন তাকিয়ে ওর পথের দিকে। ঢাকায় থাকে এক মহিলার বাসায়, টাকার বিনিময়ে থাকা-খাওয়া। জীবনের অভিব্যক্তি একজন গল্পকার কতভাবেই না ফোটাতে পারেন! তিনি শাহজাহান চরিত্রটাকে আঁকলেন এভাবে—‘বরং জ্বর হলে আমার মাথায় সব নতুন নতুন আইডিয়া খেলতে থাকে। পদ্ম ফুল দেখেছিস? পদ্ম ফুল ফুটতে দেখেছিস? আমি একদিন ঝিলের পাড়ে সারা রাত বসে পদ্ম ফুটতে দেখেছি। একের পর এক পদ্ম ফুল ফুটতে দেখেছি। সেটা ছিল আমার শখ। এই দ্যাখ, এমন করে পদ্ম ফুল ফোটে, এই এমনি করে।’ শিরাবহুল দুই হাত এক করে সে বন্ধুদের পদ্ম ফোটা দেখাল। গল্পটা আনোয়ারা সৈয়দ হক লিখেছিলেন ষাটের দশকের শেষের দিকে, ১৯৬৭ সালে। সেই রুদ্ধশ্বাস সময়ের যন্ত্রণা, অশ্রুপাত এবং যৌবনের সর্বনাশের ছবি অবাক কুশলতায় তিনি ফুটিয়ে তোলেন, শৈলকুপার শাহজাহান প্রতীকে। ‘নরক ও ফুলের কাহিনী’ বইয়ে অসামান্য নিপুণতায় নিজের শৈশবের কাল তুলে এনেছেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। কোনো ভণিতা নয়, নয় সত্য এড়িয়ে ফোলানো-ফাঁপানো কাহিনি। জীবনের ঊষাকালে যা দেখেছেন, যা শুনছেন, নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনির মতো লিখেছেন।  বিশাল বই ‘নরক ও ফুলের কাহিনী’। তিনি যে জীবনের পিঠে জন্মেছিলেন, সেটা এই জীবনের তুলনায় নরকই। সেই নরকের নরকযন্ত্রণার সঙ্গে ফুলের বিকাশেরও যে নিবিড় গভীর সম্পর্ক, নির্দ্বিধায়, অকপট সত্তায় প্রকাশ করেছেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। এবং এই সাহসী সৌন্দর্যের মধ্যে তিনি অবাক ফুল হয়ে ফুটেছেন নিজের জন্য যেমন, সংসারের জন্যও তেমনি। বাংলা সাহিত্যের জন তো বটেই।

n লেখক :কথা সাহিত্যিক