চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধীরা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২০, ২২:২৯

চট্টগ্রামে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কিশোর অপরাধীরা। ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত সংঘবদ্ধ অপরাধীরা নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই তত্পর। চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ইয়াবা ব্যবসা, জায়গাজমি, দোকানপাট দখলসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যেখানে কিশোর অপরাধীদের নাম আসছে না। তুচ্ছ কারণে মারামারি, হাতাহাতি থেকে শুরু করে খুনখারাবি করতেও দ্বিধা করছে না এরা। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে যারা কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ে আবার কখনো এলাকাভিত্তিক বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছে। পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ‘ওপরের চাপে’ এদের ছেড়ে দিতে হয়। কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একশ্রেণির অসাধু পুলিশ সদস্য কিশোরদের নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ইন্ধন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসপারকে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে হত্যা করেছিল সাব্বির নামে এক কিশোর। হত্যাকাণ্ডের পর পাড়ায়-পাড়ায় সক্রিয় কিশোর অপরাধী গ্রুপের তালিকা করা হয়েছিল। কিশোরদের আড্ডায় নিয়মিত হানা দিতে শুরু করেছিল পুলিশ। কিন্তু পুলিশের এই কার্যক্রম এখন অনেকটাই স্থবির। জানা গেছে, অধিকাংশ কিশোর অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ এসব চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। এসব কিশোর ও সদ্য কৈশোর পার করা তরুণরা রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতেও সক্রিয়। 

আদনান হত্যার পর পুলিশ               অপরাধে জড়িত কিশোর ও অপরাধপ্রবণ এলাকার যে তালিকা করেছিল সেখানে প্রায় ৫৫০ জন কিশোরের নাম এসেছিল। অপরাধপ্রবণ স্পটের নাম এসেছিল প্রায় ৩০০। এসব কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের জন্য নগরীর লালখানবাজার, চকবাজার, নন্দনকানন, সিআরবি, বিশ্বকলোনি, বহদ্দারহাট, পলিটেকনিক এলাকার কয়েক জন আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতার নাম পেয়েছিল পুলিশ। তবে ঐ তালিকা নিয়ে খোদ পুলিশের মধ্যেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। ঐ তালিকাটি করা হয়েছিল ওসি লেভেলের ওপরের কর্মকর্তাদের দিয়ে। তাই মাঠ পর্যায়ে ওসিদের মধ্যে সেই তালিকা নিয়ে কাজ করার তেমন একটা আগ্রহ ছিল না।

চট্টগ্রামের একেকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একেকটি গ্রুপ। এক গ্যাংয়ের সদস্য আরেক এলাকায় ঢুকে পড়লে তাকে বিপদে পড়তে হয়। এসব কিশোর গ্যাংয়ের রয়েছে বাহারি সব নাম। অনেক সময় গ্যাং প্রধানরা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করে, যাতে কোমলমতি কিশোররা উদ্বুদ্ধ হয়।

চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে দুটি কারণকে বড় করে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে—করোনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। অলস সময় কাটাতে কিশোর বয়সিরা মেতে উঠছে আড্ডাবাজিতে। আড্ডার সূত্র ধরে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় কিশোর গ্যাং। শুরু হয় অপরাধের পথে পা বাড়ানো। এর পাশাপাশি করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে অনেক কিশোর ও তরুণ। বেকার হয়ে পড়া কিশোর তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ জীবন-জীবিকার তাগিদে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এ দুটি কারণ ছাড়াও অনেকে নিজের বাহাদুরি জাহির করতে কিশোর গ্যাংয়ে নাম লেখাচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসীদের বিশেষ সমীহ করা হয়। সদস্য সংখ্যা বাড়াতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে কিশোর গ্যাংগুলো।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নগরীতে কথিত বড় ভাই রয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন। কথিত বড় ভাইদের মধ্যে রয়েছেন—চকবাজারের নুর মোস্তফা টিনু, রবিউল ইসলাম রাজু, চকবাজার-পাঁচলাইশের সাদ্দাম হোসেন ইভান, বহদ্দারহাটের এরশাল, এসকান্দার, আগ্রাবাদ ও ডবলমুরিংয়ের মোস্তফা কামাল, জহির উদ্দিন বাবর, এস এম পারভেজ, সুমন ওরফে দাঁতলা সুমন, সদরঘাটের রাজন ওরফে রাজু, চট্টগ্রাম রেল স্টেশন এলাকার শাহ আলম, জামতলী বস্তির হারুন ও আলো, বায়েজিদ এলাকার মোহাম্মদ দুলাল প্রকাশ লাল দুলাল, মো. জাবেদ প্রকাশ ডিশ জাবেদ, মফিজ আলম প্রকাশ বাংলা মফিজ, সোহেল প্রকাশ গুটি সোহেল ও সালাউদ্দিন।

চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমাতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ অভিযানের অভিজ্ঞতাকে ‘তিক্ত’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিগত কিছুদিন কিশোর গ্যাং নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। বাবা-মা আদর করে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেকে মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছেন। আমরা যদি আটকাই তাহলে তারা এসে তদবির করছেন। মোটরসাইকেল কেন দিয়েছেন জানতে চাইলে বাবা-মা এককথায় উত্তর দেন, ছেলে শখ করে চেয়েছে। তাই দিয়েছি। এই শখ ছেলেকে কোন রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছে—আমরা কিন্তু তার খবরও রাখি না।