যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিভক্তির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। বাংলাদেশ সময় গতকাল বুধবার রাত ২টা পর্যন্ত ৪৪টি অঙ্গরাজ্যের বেসরকারি ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ২৪৮টি ইলেকটোরাল ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ২১৪টি ইলেকটোরাল ভোট। ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট বা দোদুল্যমান রাজ্য মিশিগান (ইলেকটোরাল ভোট- ১৬) এবং নেভাদায় (৬) এগিয়ে রয়েছেন বাইডেন। শেষ মুহূর্তে নাটকীয় কিছু না ঘটলে এই দুই রাজ্যে জিতলেই ম্যাজিক ফিগার ২৭০ ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে ট্রাম্পের জয়ের পথ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। তাকে অবশ্যই মিশিগান এবং নেভাদার একটিতে জিততে হবে। একইসঙ্গে জিততে হবে পেনসিলভেনিয়ায় (২০)।
ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের পাশাপাশি জরিপের ফল অনুযায়ী পপুলার ভোট বেশি পেয়েছেন জো বাইডেন। গতকাল রাত পর্যন্ত গণনায় তিনি পেয়েছেন ৬ কোটি ৯৪ লাখ ৯ হাজার ৬০৮ ভোট। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প পেয়েছেন ৬ কোটি ৬৫ লাখ ১৮ হাজার ৪৭৮ ভোট। বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে ২৮ লাখের বেশি ভোট পেয়েছেন। মোট ভোটের মধ্যে বাইডেন পেয়েছেন ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ আর ট্রাম্প পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। জানা যাচ্ছে, ১৬ কোটির বেশি ভোটার এবার ভোট দিয়েছেন নির্বাচনে। করোনা মহামারির কারণে ১০ কোটির বেশি রেকর্ড আগাম ভোট পড়েছে। সব মিলিয়ে গত ১২০ বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। ইউএস ইলেকশন প্রজেক্ট বলছে, এবারে ভোটের হার ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ- যা ১৯০০ সালের পর সর্বোচ্চ।
এদিকে সব ভোট গণনার আগেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যথারীতি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিশিগানে মামলা করেছেন এবং উইসকনসিনে ভোট পুনঃগণনা চেয়েছেন। দৃশ্যত তিনি হার মানতে নারাজ। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সহিংসতার আশঙ্কায় ওয়াশিংটন ডিসিসহ বিভিন্ন শহরে থমথমে ও ভুতুড়ে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভোটের রাতেই অনেক বড় শহরে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্কাবস্থায় রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। খবর সিএনএন, বিবিসি, আল জাজিরা ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হতে যেকোনো প্রার্থীর ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট প্রয়োজন। ৫০ রাজ্যে মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮টি। ওয়াশিংটন ডিসির ৩ জনসহ ৪৩৮ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (নিম্নকক্ষ) এবং ১০০ জন সিনেটর (উচ্চকক্ষ) মিলে ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা করা হয়। মেইন ও নেব্রাস্কা রাজ্য ছাড়া ৪৮টি রাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে যিনি যে রাজ্যে সর্বোচ্চ পপুলার ভোট পাবেন তিনি ওই রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পাবেন। নেব্রাস্কা ও মেইন রাজ্যের পপুলার ভোটের বিজয়ীরা পান দুটি করে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল) বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে ফল আসতে শুরু করে। একেক রাজ্যে ভোট গ্রহণের সময় ও গণনার নিয়ম ভিন্ন হওয়ায় বেসরকারি ফল পেতে বিলম্ব হবে আগেই ধারণা করা হয়েছিলো। বিশেষ করে, যেসব রাজ্যে বেশি আগাম ভোট পড়েছে এবং নির্বাচনের দিনের পরও ডাকযোগে আসা ব্যালট গ্রহণ করা হচ্ছে সেখানেই ভোট গণনায় বিলম্ব হচ্ছে। এই কারণে কে প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন সেটা জানতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এছাড়া বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।
গতকাল ৪৪টি অঙ্গরাজ্যের ভোটের বেসরকারি ফল অনুযায়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেন পেয়েছেন ২৪৮টি ইলেকটোরাল ভোট। অন্যদিকে ট্রাম্প পেয়েছেন ২১৪টি। দুই প্রার্থীই নিজ নিজ দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রাজ্যগুলোতে জয় নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াই গড়িয়েছে ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেট বা দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে। যেসব রাজ্যে প্রার্থী আর ইস্যুর বিবেচনায় ভোট দিয়ে থাকেন বেশিরভাগ ভোটার।
গতকাল রাত পর্যন্ত ছয় রাজ্যের বেসরকারি ফলাফল জানা সম্ভব হয়নি। এগুলো হলো, আলাস্কা (ইলেকটোরাল ভোট ৩), জর্জিয়া (১৬), মিশিগান (১৬), নেভাদা (৬), নর্থ ক্যারোলিনা (১৫) ও পেনসিলভেনিয়া (২০)। দুই প্রার্থীরই ভাগ্য ঝুলে আছে এই রাজ্যগুলোতে। আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিলো যে এবারের নির্বাচনের চূড়ান্ত লড়াই গড়াবে পেনসিলভেনিয়া, মিশিগান, উইসকনসিন, নর্থ ক্যারোলিনার মতো ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে।
মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর তথ্য ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মিশিগান (১৬) ও নেভাদায় (৬) এগিয়ে রয়েছেন জো বাইডেন। এই দুই রাজ্যে জিতলেই ২৭০ ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন তিনি। অন্যদিকে আলাস্কা (৩), নর্থ ক্যারোলিনা (১৫), পেনসিলভেনিয়া (২০) ও জর্জিয়ায় (১৬) এগিয়ে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এসব রাজ্যে জিতলে ট্রাম্প মোট ইলেকটোরাল ভোট পাবেন ২৬৮টি। সেক্ষেত্রে তাকে জিততে হলে মিশিগান বা নেভাদাতে অবশ্যই জয় পেতে হবে।
নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা ট্রাম্পের
ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই এমনকি স্পষ্ট কোনো পূর্বাভাসের আগেই নিজেকে বিজয়ী দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে এক বক্তৃতায় কোনো প্রমাণ ছাড়াই নিজেকে জয়ী ঘোষণা করেছেন তিনি। ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ডাকাযোগে ভোট প্রতারণার অভিযোগ করে তা নিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন।
ভোট দেওয়ার জন্য মার্কিনিদের ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা বিজয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম, সত্যি বলতে, আমরাই বিজয়ী হয়েছি। তিনি বলেন, নির্বাচনে কারচুপি করা হয়েছে। এটা আমেরিকান জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। আমরা সুপ্রিম কোর্টে যাবো। এখন আমরা সব ভোট গণনা কার্যক্রম বন্ধ চাই। এটা খুবই দুঃখজনক একটি মুহূর্ত। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স আগেই কোনো জয় ঘোষণা করতে রাজী হননি এবং বলেছেন সব বৈধ ভোট গণনা করা হবে।
অন্যদিকে ডেলাওয়ারের উইলমিংটনে এক বক্তৃতায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন বলেন, তারা জয়ের পথে রয়েছেন বলে বিশ্বাস করেন। প্রতিটা ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটার (নির্বাচনী প্রক্রিয়ার) সমাপ্তি হবে না। বাইডেনের ক্যাম্পেইন টিম গণনার অপেক্ষায় থাকা পোস্টাল ভোট নিয়ে বৈধতার যে অভিযোগ তুলেছেন প্রাম্প তাকে ‘নজিরবিহীন ও অসত্য’ আখ্যায়িত করেছে।
থমথমে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে
নির্বাচনের রাতে যখন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যখন ভোট গণনা চলছে, তখন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ডিসিতে বিক্ষোভ করেছেন। বেশিরভাগ স্থানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চললেও হোয়াইট হাউজের বাইরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। তাদের মিছিলের কারণে শহরের অনেক এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীরা শ্লোগান দিচ্ছেন, আমরা যদি বিচার না পাই, তাহলে তোমরা শান্তিও পাবে না।
লস অ্যাঞ্জেলস, ক্যালিফোর্নিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, পোর্টল্যান্ড, ওরেগন এবং নিউ ইয়র্ক শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কায় আগে থেকেই বিভিন্ন শহরের ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট তালাবন্ধ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলার পর পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক আমেরিকান তাদের উদ্বেগের কথা বলছেন তারপরেও বড় ধরণের কোনো সহিংসতার দিকে যাবে কিনা পরিস্থিতি তা বলার মতো যথেষ্ট সময় এখনো আসেনি।
