প্রখ্যাত ফরাসি রাজনীতিবিষয়ক দার্শনিক ও বিচারপতি মন্টেস্কুর বক্তব্যে আছে, ‘প্রশাসনের মাহাত্ম্য নির্ভর করে ক্ষমতাসীনদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতা ব্যবহারের ধরনের উপর।’ মন্টেস্কুর এই বাক্য চিরন্তন বাণীর মতো সত্য। ক্ষমতাসীনদের আচরণের উপর অনেকটাই নির্ভর করে প্রশাসন কতটা দক্ষতা ও দায়িত্বের সহিত কাজ করিবে। কথিত আছে, যেই সচিব প্রধানমন্ত্রী ভারতের সুপ্রসিদ্ধ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সহিত বিনীত বিতর্কে লিপ্ত হইতেন, সেই সচিবই উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের কক্ষে ঢুকিতে সাহস করিতেন না। ইহার প্রধান কারণ ছিল সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ব্যক্তিত্ব ও কর্মজ্ঞান। তিনি সহসাই তাহার টেবিলে উপস্থাপিত ফাইলের দুর্বলতা ও অসংগতি ধরিয়া ফেলিতেন। বাংলাদেশেও আমরা হাতে গোনা এইরূপ কর্মদক্ষ মন্ত্রী দেখিয়াছি, যাহারা সচিবসহ কর্মকর্তাদের কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখিতে পারিতেন। উপরের এই বক্তব্য মাঠ পর্যায় পর্যন্ত সত্য।
দুঃখের বিষয়, এমন সকল ব্যক্তির রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটিয়াছে, যাহারা আইন ও আইনের শাসন সম্পর্কে অবগত নহেন, সচেতন নহেন। তাহারা এমন সকল আচরণ ও সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান লইয়া থাকেন যাহা প্রশাসনের কর্মপদ্ধতি ও কার্যাবলির সহিত সংগতিপূর্ণ নহে। ফলে প্রশাসনেও এমন অবস্থা সৃষ্টি হইয়াছে যে, তাহারাও নিজেদের মতো করিয়া সকল কিছু চালাইতেছেন। প্রশাসন কীভাবে চলিতেছে সেই সম্পর্কেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টদের নিকট অজানা রহিয়া যাইতেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রায়শই অভিযোগ করিতে শুনা যায়, তাহাদের কথায় কিছু হয় না। অর্থাত্ তাহাদের কথা প্রশাসন শুনে না; কিন্তু প্রশ্ন হইল, তাহারা প্রশাসনকে কী কথা বলিয়া থাকেন? তাহাদের সেই সকল কথা কতটা বিধিসম্মত হইয়া থাকে? একজন ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদ আইনসম্মত কথা বলিলে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শুনিবেন না, বাংলাদেশের পরিস্থিতি বোধকরি এতটা মন্দ হয় নাই।
দ্বিতীয়ত, যাহারা দেশের ঐতিহ্যবাহী এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটিতে প্রবেশ করিয়াছেন, তাহারা কতটা দায়িত্ব লইয়া কথা বলিতেছেন? আমরা লক্ষ করিলেই দেখিব, একদিকে জনগণের অন্যদিকে প্রশাসনের; কিন্তু সরকারের প্রধান নির্বাহীর প্রতি কোনো অভিযোগ নাই। অথচ সরকারে থাকা এই প্রধান দলটিকেই সকল ধরনের কুকর্মের দায় বহন করিতে হইতেছে। সংবাদপত্র খুলিলেই দেখিতে পাওয়া যায়—দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী বাড়ি দখল, জমি দখল, চাঁদাবাজি এমনকি ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করিয়া থাকেন ক্ষমতার সাইনবোর্ড টাঙাইয়া। ইহাদেরই কেহ কেহ আবার দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে পুঁজি করিয়া নির্বাচিত প্রতিনিধি বনিয়া যাইতেছেন। ফলে এই সকল ব্যক্তির প্রতি প্রশাসনেরও আস্থা কমিয়া যায়। আবার ক্ষেত্রবিশেষ প্রশাসনের কেহ কেহ রাজনৈতিক সুবিধা লইবারও প্রয়াস পান। আবারও উল্লেখ করিতে হয়, নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি যদি জনগণের পক্ষ লইয়া ন্যায্য কথা বলেন, তাহা গুরুত্ব দিয়া অনুসরণ করা একজন সরকারি কর্মকর্তার দায় হইয়া পড়ে; কিন্তু যখনই একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি ব্যক্তিগত সুবিধাদির জন্য চাপাচাপি করিতে থাকেন, তখন প্রশাসন বিচ্ছিন্নভাবে পর্দার আড়ালে চলিয়া যায়। সুতরাং আমরা মনে করি, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং দলের সদস্যদের আইন ও নিয়মনীতির পথে চলিতে কঠোর নির্দেশনা প্রয়োজন। প্রশাসনিক কর্মপদ্ধতিতে ত্রুটি অথবা দুর্বলতা থাকিলে প্রয়োজনে তাহা সংশোধন করা হউক; কিন্তু বিদ্যমান, আইন, বিধিবিধান ও নিয়মাবলির ব্যত্যয় ঘটাইবার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নহে।
