শুধু বাংলায় নয়, বিভিন্ন ভাষায় ঘুরেফিরে এই প্রবাদটি এসেছে—‘বংশ দেখে পাত্র-পাত্রী খুঁজতে হয়’। এর সহজ অর্থ হচ্ছে ভালো বংশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার উপদেশ। ভালো বংশের ছেলে বা মেয়ে অভ্যাসগতভাবে ভালো চরিত্র এবং ভালো ব্যবহারের মালিক হতে পারে—এমন একটা ধারণা থেকে এই প্রবাদটি মানবসভ্যতার জন্ম থেকেই চালু হয়ে আছে। এটা মূলত একটি মাইন্ড সেটের ব্যাপার। ভালো বংশের সন্তান চোর-ডাকাত-দুর্নীতিবাজ হবে না—এমনটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। তবুও মাইন্ড সেটের কারণে কিছুটা দুর্বলতা থাকে ভালো বংশের প্রতি। এই মাইল্ড সেট শুধু পারিবারিক ক্ষেত্রেই নয়, এর ব্যাপ্তি সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলেও বিদ্যমান। আমরা যাকে বলি ‘সংস্কার কিংবা কুসংস্কার’ তা মানুষের অভ্যাসগত মাইন্ড সেট বই অন্য কিছু নয়। এমন মাইন্ড সেট কখনো কখনো দেখা যায় জন্ম থেকেই প্রাপ্তি। মানুষ হিন্দু পরিবারে জন্ম নিয়েই পারিবারিক অভ্যাসগত কারণে হিন্দু ধর্মের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে; কেউ দুর্বল হয়ে পড়ে ইসলাম ধর্মের প্রতি, আবার কেউ-বা খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতি। ধর্মের বই পড়ে নয়, ধর্মের চর্চা করে নয়, ধর্মের অনুশীলন করে নয়—একেবারে জন্ম ইতিহাসের সঙ্গেই মানুষের ধর্মীয় মাইন্ড সেটটি তৈরি হয়ে যায়। তারপর আসে বুদ্ধি, পড়াশুনা, বিবেচনা, গবেষণা ইত্যাদি। এসব উপাদান পরবর্তী সময়ে যোগ হয়ে মাইন্ড সেটকে আরো গভীরতা প্রদান করে অথবা কারো কারো জন্য ধাক্কা দেওয়ার কাজটি করে। বড় ধাক্কা পেলে মাইন্ড সেট থেকে বেরিয়ে যেতে পারে কেউ কেউ। তাকে বলা যায় ব্যতিক্রম।
ভারতবর্ষের মানুষ একসময় একই এলাকার মানুষ ছিল। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান একইভাবে পালনে অভ্যস্ত ছিল। মাইন্ড সেট ছিল এশিয়ার তথা ভারত সভ্যতার অংশ হিসেবে। মোগল সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ শাসনামলেও ভারতবর্ষের মানুষ—সবাই একসঙ্গে ছিল। ১৮৫৭ সালে হিন্দু-মুসলমান সেনাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করতে দেখে সতর্ক হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশরা। ১৮৫৯ সালে বোম্বের ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড এলফিনস্টোন লন্ডনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন—বিভাজন ও শাসনই হলো প্রাচীন রোমান প্রবাদ বাক্য এবং আমাদেরও সে পথেই যাওয়া উচিত। তারপরই শুরু হয়ে গিয়েছিল তাদের সংগঠিত প্রচেষ্টা। সে পথ অবলম্বন করেই ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা নিয়মিত এমন সব প্রতিবেদন রচনা করতে ও সমীক্ষা চালাতে শুরু করেন, যেগুলো ভারতবাসীকে তাদের ভাষা, ধর্ম, সম্প্রদায়, জাত, উপজাত এবং গাত্র বর্ণের ভিত্তিতে আরো সংকীর্ণরূপে উপস্থাপন করার প্রয়াস পায়। দীর্ঘদিন চলে এই প্রচেষ্টা। ধীরে ধীরে নতুন একটি মাইন্ড সেটের বীজ বপন হতে থাকে ভারতবাসীর মধ্যে। এর ফলে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বড় পরিসরের ধর্মীয় হিংসা, বিদ্বেষ এবং দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। ব্রিটিশ শাসকরা এই সুযোগটি লুফে নেয়।
ব্রিটিশ একদিন চলে যায়; কিন্তু তাদের ডিভাইড নীতি রেখে যায়। সেই ডিভাইড নীতির সূত্র ধরে ধর্মীয় বিভাজনের চিন্তা-চেতনার ফলস্বরূপ ভারতবর্ষ ভেঙে যায় দুইটি রাষ্ট্রে। জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তানের। মন্দির, মসজিদ, গীর্জার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়—বৃদ্ধি পায় ধর্মীয় বিভাজন। বিভাজিত সমাজে ধর্মের হাত ধরে হিংসার মাইন্ড সেট নিয়ে বড় হতে থাকে দুইটি দেশের মানুষ। ভারতের হিন্দু শিশুরা মনে করে—পাকিস্তান তাদের শত্রু। পাকিস্তানের শিশুরা মনে করে—ভারত তাদের শত্রু। এই মাইন্ড সেট সময়ের ব্যবধানে আরো মজবুত হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিসমাজ এমন মাইন্ড সেটের বিপক্ষে অবস্থান নিতে থাকে। দীর্ঘদিনের সংগ্রামে এখানে বাঙালিসমাজে একটি নতুন মাইন্ড সেটের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাঙালি মানবতাবাদী মানুষ হয়ে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান একসঙ্গে গর্জে ওঠে। ছিনিয়ে আনে বাংলাদেশ। সূচিত হয় একটি নতুন মাইন্ড সেট। ধর্মীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়; কিন্তু অস্থির পৃথিবী আর অস্থির ধর্মীয় চিন্তাভাবনা বাঙালির এই মাইন্ড সেটে আঘাত হানতে থাকে একের পর এক। পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে পরাজিত হলেও বাঙালির নতুন মাইন্ড সেট মেনে নিতে পারেনি কখনো। সেই ব্রিটিশ কায়দায় তারাও তত্পর।
সম্প্রতি আলজাজিরা টেলিভিশনে ভারত-পাকিস্তানের ধর্মীয় মানুষের ওপর একটি চমত্কার অনুসন্ধানী রিপোর্টিং দেখছিলাম। রিপোর্টার চমত্কারভাবে প্রথমে বর্ণনা করেছেন, এই দুই দেশের মানুষের মধ্যে একের জন্য অন্যের কতটুকু ঘৃণা বা বিদ্বেষ বিদ্যমান আছে। শুধু বর্ডারের যুদ্ধ নয়, সামাজিক জীবনের স্তরে স্তরে একের প্রতি অন্যের যে ঘৃণা-বিদ্বেষ জাগ্রত আছে তা তুলে ধরেছেন রিপোর্টার। তিনি এরপর দুই দেশের বেশ কিছু শিশু শিক্ষার্থীর সাক্ষাত্কার নিয়েছেন। ভারতের শিশুরা বলেছে, পাকিস্তান আমাদের শত্রু; কেননা পাকিস্তান আমাদের দেশের ক্ষতি চায়। পাকিস্তানের শিশুরা বলেছে, ভারত আমাদের শত্রু; কেননা ভারত আমাদের ধ্বংস করতে চায়। যে শিশু এখনো তার জ্ঞান দিয়ে সঠিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখে না, সে প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলছে—প্রতিবেশী দেশটি শত্রুর দেশ। রিপোর্টটির শেষ ভাগে ছিল সংগ্রামের কথা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন ছিল শেষ অধ্যায়ে। এসব ছাত্রছাত্রী একের সঙ্গে অন্যের সহযোগিতার কথা বলেছে, সংস্কৃতির আদানপ্রদানের কথা বলেছে, ক্রিকেটের কথা বলেছে, নিজের মধ্যে আত্মিক সম্পর্কের কথা বলেছে।
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী এবং মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখার এবং অনুভব করার সময় এসেছে হয়তো। ভারত এবং পাকিস্তানের সংগ্রামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কতটা এগিয়ে যেতে পারবে জানি না। তবে তারা হয়তো শুরুটা করে যেতে পারে নতুন যুগের একটি নতুন মাইন্ড সেট। প্রতিবেশী আমার শত্রু—এই মাইন্ড সেট থেকে আগামী দিনের কোটি শিশুকে উদ্ধারের স্বপ্ন দেখার সময় এসেছে। কড়া নাড়ছে সবার দরজায়। কতজন সেই কড়া নাড়ার জবাব দেবে তা খুব বড় প্রশ্ন নয়। কড়া যে নাড়া হচ্ছে এমনটাই আগামী প্রজন্মের জন্য যথেষ্ট। শত্রুতা নয়, বিদ্বেষ নয়; বরং শান্তি আর বন্ধুত্বই হতে পারে নতুন সময়ের বড় হাতছানি। শিশুটি আর তার চোখে সংঘাত, হিংসা, বিদ্বেষ দেখবে না। নেগেটিভ মাইন্ড সেটের স্থলে পজিটিভ মাইন্ড সেট নিয়ে জন্ম নেবে বিশ্ব শিশুরা। জয় করবে তারা হিংসা, বিদ্বেষ আর ঘৃণা।
একটি দেশ, দেশের মানুষ কিংবা পুরো জাতি কখনো ঘৃণার অনলে পুড়তে পারে না। হয়তো একদিন পকিস্তানের কোনো এক সরকার এবং ভারতের কোনো এক সরকার ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। তাই বলে ভারতের শিশুটি পাকিস্তানের শিশুটিকে স্থায়ীভাবে শত্রু ভেবে বসবে—এমন একটি ভুল মাইন্ড সেট চিরদিনের জন্য বাঁচতে পারে না। ব্রিটিশ শাসন করেছিল একসময় ভারতবর্ষকে; ভারতবর্ষকে ছিবড়ে করে ছেড়ে দিতে চেয়েছিল ব্রিটিশ শাসকরা। ২০০ বছর আগের ব্রিটিশ আর আজকের ব্রিটিশ কি এক জায়গায় আছে? তবে পাকিস্তান কেন সারা জীবন ধরে ভারতের সঙ্গে শত্রু হয়ে থাকবে? একসময় তো ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ একসঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে নৌকায় পাল তুলেছে সমুদ্র পাড়ি দিতে। তবে আজকের প্রজন্ম কেন একে অপরকে শত্রু ভেবেই যাচ্ছে? কেন প্রতিবেশী দেশের নাগরিক হলেই শত্রু হয়ে যাচ্ছি আমরা? কেন ফেলে যাওয়া সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে শত্রু সম্পত্তি? বিদ্বেষ ছড়িয়ে, হিংসা বাড়িয়ে কী লাভ হচ্ছে একে অপরের? লাভ যে কিছুই হচ্ছে না তা পাকিস্তানের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বিদ্বেষ, হিংসা, জঙ্গিবাদ, শত্রুতা—এসবকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পাকিস্তান ধীরে ধীরে একঘরে দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। কেউ নেই তার পাশে। প্রতিবেশী তার শত্রু। মানবতাবাদী মানুষ দেশ ছাড়ছে একের পর এক। মেধাহীন একটি সমাজব্যবস্থার মধ্যে ক্রমেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে পাকিস্তান। তাদের এ পরিণতি দেখে কি পাকিস্তানের শিশুরা তাদের মাইন্ড সেট পরিবর্তন করবে না? তারা কি ভারতকে শত্রুই ভেবে যাবে অনন্ত কাল ধরে? ভারতের আজকের শিশুটিও কি পাকিস্তানিকে শত্রু ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারবে না? বাংলাদেশের মানুষ কি প্রতিটি পাকিস্তান নাগরিককে দায়ী করবে তার কষ্টের কারণে? আগামী দিনের শিশুর জন্য, আগামী দিনের সমৃদ্ধি আর প্রগতির জন্য এগিয়ে আসতে হবে একটি মহামিলনের মাইন্ড সেট সামনে নিয়ে। তবেই আসবে প্রগতি, মানবতা আর সমৃদ্ধি। অন্যথায় তিমির হয়ে উঠবে মহাতিমির এবং একদিন আমাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে অশান্তির মহাপ্লাবনের স্রোতে।
n লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
