করোনার প্রকোপ শুরুর পর অর্থনীতি চাঙা রাখতে যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে সেটি বাস্তবায়নে ধীর গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বড় উদ্যোক্তারা এর থেকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা অনেক কম সুবিধা পেয়েছে। সার্বিকভাবে এ পর্যন্ত প্রণোদনা যতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তার সুফল মাত্র ৮ শতাংশ কর্মসংস্থানে গিয়েছে। প্রণোদনার অর্থ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হলেও মাত্র ১২ শতাংশ কর্মসংস্থানে এর প্রভাব ফেলতে পারবে। ‘কর্মসংস্থানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রণোদনা প্যাকেজের তাত্পর্য অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এ তথ্য জানানো হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), অক্সফাম এবং এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফরম এই ভার্চুয়াল আলোচনায় গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য উল্লেখ করা হয়। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন, শ্রম সচিব কে এম আব্দুস সালাম, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট কামরান টি. রহমান, বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ প্রমুখ।
মূল উপস্থাপনায় সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান উল্লেখ করেন, অতিমারির প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশে যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে সেটি উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। প্রণোদনার আকারের দিক থেকে ৩১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২২তম। প্রণোদনার আকার আমাদের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মাথাপিছু মাত্র ৭৫ ডলার। মাথাপিছু বরাদ্দে ৩১টি দেশের মধ্যে ২৩তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ বাদ দিলে অন্য দেশের তুলনায় আমাদের প্রণোদনার আকার ছোট। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন যে সমস্যায় পড়েছে সেটি হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সহায়তা নিয়ে। এ পর্যন্ত প্রণোদনার যে অর্থ ছাড় হয়েছে তাতে বড় শিল্পের জন্য ৭০ শতাংশ কিন্তু ছোট ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ছাড় হয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশ। মাত্র ৩২ হাজার ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান এ খাত থেকে উপকার পেয়েছে। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বড় উদ্যোক্তাদের জন্য যে প্রণোদনা রয়েছে, সেটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে মাত্র ৯ থেকে ১০ লাখ কর্মসংস্থান উপকৃত হবে। এসএমই খাতে যতটুকু প্রণোদনা গেছে তাতে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার কর্মসংস্থানে এর সুফল মিলেছে। পূর্ণভাবে হলে মাত্র ৪ লাখ ৪০ হাজার কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলবে। তাই কর্মসংস্থানের বিশাল অংশে প্রণোদনার অর্থ ঠিকভাবে পৌঁছাতে পারবে না। তাই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতি সহায়তা প্রয়োজন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশে সময়মতো প্রণোদনা ঘোষণা করা হলেও এটি প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয় বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। যেটুকু বৈদেশিক সহায়তা এসেছে সেটি কর্মসংস্থানে কতটা সুফল পেয়েছে তা আগামী দিনের আলোচনায় আসতে হবে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে। এজন্য মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। প্রণোদনার সঠিক বাস্তবায়নে যেমন মাঠ পর্যায়ে দুর্বলতা দেখা গেছে তেমনি দুর্নীতিও এর একটি বড় কারণ বলে উঠে এসেছে। করোনার এই সময়ে ১২৫ স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রণোদনা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের ওপর সরকারকে বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার যে সহায়তা দিচ্ছে সেটির প্রচারণার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। তাছাড়া কাকে দেওয়া হচ্ছে, সঠিক ব্যক্তিকে দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ব্যয় কর্মসংস্থানের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত করা যায় সেটিও দেখতে হবে। বাংলাদেশের বেকারত্বের হার যে পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হয় সেটি এখন অচল। কারণ আমরা দেখেছি উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে প্রতি তিন জনের এক জন বেকার। তাই নীতি সহায়তার জন্য সঠিক তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিকে কর্মসংস্থানের কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে হবে। এজন্য প্রচলিত প্রণোদনার টোটকা ওষুধের পরিবর্তে স্থায়ী পদ্ধতির দিকে আগামীতে যেতে হবে।
