নতুন নেতার অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২০, ০০:৪৪

উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য অপেক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাড্ডাহাড্ডি হওয়ায় ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা পরও কে জিততে চলেছেন তার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে না। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এখন পর্যন্ত ২৫৩টি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২১৪টি ভোট পেয়েছেন।

আগাম ভোট বেশি পড়ায় এখনো ছয়টি রাজ্যে ফল গণনা চলছে। এসব রাজ্যেই নির্ধারিত হবে দুই প্রার্থীর ভাগ্য। জো বাইডেন সব ভোট গণনার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের দিনের পর প্রাপ্ত ভোট গণনার বিপক্ষে। তিনি টুইটার বার্তায় ভোট গণনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এমন কি জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ভোট গণনা বন্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি এমন অবস্থান নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। নিউ ইয়র্কসহ কয়েকটি শহরে প্রতিবাদ বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে। অ্যারিজোনা ও পেনসিলভেনিয়ায় ভোট গণনা কেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ করেছে ট্রাম্পের সমর্থকরা। এসব গণনা কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সশস্ত্র কর্মকর্তাদের পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ।

জিততে কার কত ভোট দরকার

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হতে ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট প্রয়োজন। ৫০ রাজ্যে মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা ৫৩৮টি। গতকাল রাত ১০টা (বাংলাদেশ সময়) পর্যন্ত ৪৪ রাজ্যের বেসরকারি ফলাফলে কেউই ২৭০ ইলেকটোরাল ভোট পাননি। যে কারণে ভোট গণনার শেষ মুহূর্তে ছয় রাজ্যে ঝুলছে দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর ভাগ্য। এখনো এই ছয়টি রাজ্যে ভোট গণনা চলছে। এগুলো হলো—আলাস্কা (ইলেকটোরাল ভোট ৩), জর্জিয়া (১৬), নেভাদা (৬), নর্থ ক্যারোলিনা (১৫), অ্যারিজোনা (১১) ও পেনসিলভেনিয়া (২০)। এসব রাজ্যে মোট ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে ৭১টি। এর মধ্যে ট্রাম্পের জয়ী হতে লাগবে ৫৬টি ইলেকটোরাল ভোট। আর জো বাইডেনের দরকার ১৭টি ভোট। যে কারণে ট্রাম্পের চেয়ে বাইডেনের জয়ের পথটা অনেক বেশি সহজ।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, আলাস্কা ও নর্থ ক্যারোলিনাতে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই দুই রাজ্যে রয়েছে ১৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট। এই দুটিতে জিতলে ট্রাম্পের হবে ২৩২টি ভোট। সেক্ষেত্রে তার জিততে আরো ৩৮টি ভোট লাগবে। ট্রাম্পকে তখন অবশ্যই পেনসিলভেনিয়ায় জিততে হবে। এর সঙ্গে জিততে হবে জর্জিয়া এবং অ্যারিজোনা কিংবা নেভাদার কোনো একটিতে। অর্থাত্ ট্রাম্পকে পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে জিততে হবে।

কিন্তু ভোটের হিসাব বলছে, ট্রাম্পের জন্য পাঁচটিতে বিজয়ী হওয়া কঠিন। পেনসিলভেনিয়ায় এখন পর্যন্ত ৮৯ শতাংশ ভোট গণনা করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে তিনি এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু এখনো প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার ভোট গণনা বাকি রয়েছে। যার বেশির ভাগ ভোটই ডাকযোগে দেওয়া। এখন পর্যন্ত ডাকযোগের ভোটে এগিয়ে রয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। সেক্ষেত্রে সব ভোট গণনার পর ফল কী দাঁড়ায় সেটা বলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জর্জিয়াতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এগিয়ে রয়েছেন প্রায় ১৮ হাজার ভোটে। সেখানে ৯৬ শতাংশ ভোট গণনা হয়েছে। এখানে প্রায় ২ লাখ ভোট গণনা বাকি রয়েছে। শেষদিকে গণনা হচ্ছে ডাকযোগে আসা ভোট। এই রাজ্যেও পূর্বাভাস করা কঠিন। অন্যদিকে অ্যারিজোনাতে ৭০ হাজার ভোটে এগিয়ে রয়েছেন বাইডেন। এই রাজ্যে এখনো ৪ লাখ ৭০ হাজার ভোট গণনা বাকি রয়েছে। এই রাজ্যেও শেষ মুহূর্তে ডাকযোগের ভোট গণনা হওয়ায় বাইডেনের জয়ের সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে নেভাদায় মাত্র ৮ হাজার ভোটে এগিয়ে আছেন বাইডেন। সেখানে এখনো ১ লাখ ৯০ হাজার ভোট গণনা বাকি রয়েছে। যে কারণে এ রাজ্যে কে জিতবেন সেটা বলা মুশকিল।

সিএনএন বলছে, এ অবস্থায় ট্রাম্পের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন বাইডেন। কারণ ট্রাম্পকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া এবং একই সঙ্গে অ্যারিজোনা কিংবা নেভাদাতে জয় পেতে হবে। অন্যদিকে বাইডেনের রয়েছে ২৫৩টি ইলেকটোরাল ভোট। তিনি অ্যারিজোনা এবং নেভাদাতে এগিয়ে রয়েছেন। এই দুটিতে জয় পেলেই কাঙ্ক্ষিত ২৭০ ভোট পেয়ে যাবেন। আবার শুধু পেনসিলভেনিয়াতে জিতলেই আর পিছু তাকাতে হবে না বাইডেনের।

ভোট গণনার পক্ষে বাইডেন, অবৈধ ঘোষণার চেষ্টায় ট্রাম্প

কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনের মুখোমুখি মার্কিনিরা। এখনো ভোট গণনা চলছে। তবে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জো বাইডেন। বুধবার রাতে এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, দীর্ঘ রাত জুড়ে ভোট গণনার পর এখন ফল পরিষ্কার। আমি বিজয়ের ঘোষণা দেওয়ার জন্য আসিনি। তবে আমি এটা জানাতে এসেছি যে গণনা যখন শেষ হবে, তখন আমরা নিজেদের বিজয়ী হিসেবে দেখব বলে আত্মবিশ্বাসী। আর সেজন্য তিনি প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছেন। গতকাল এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ‘অবশ্যই সব ভোট গণনা করতে হবে।’ এরই মধ্যে জো বাইডেনের ট্রানজিশন ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’। সেখানে বলা হয়েছে, মহামারি থেকে অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে জাতিগত বৈষম্য—মারাত্মক সংকটের মধ্যে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যেতে হচ্ছে। আমাদের ট্রানজিশন টিম পূর্ণোদ্যমে প্রস্তুতি নেবে, যাতে বাইডেন-হ্যারিস প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই সক্রিয় থাকতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইটার বার্তায় বলেছেন, গণনা বন্ধ করুন। বুধবার তার ভাষণে ট্রাম্প এই নির্বাচনকে মার্কিন জনগণের ওপর এক জালিয়াতি বলে বর্ণনা করেন এবং সব ভোট বন্ধ করার ডাক দেন। যদিও পরিকল্পিত জালিয়াতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিএনএনের এক খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এখন বৈধ ভোটকে অবৈধ ঘোষণার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে যখন লাখ লাখ ভোট গণনা বাকি তখন একের পর এক টুইট করছেন এই গণনা প্রক্রিয়াকে খাটো করে দেখানোর জন্য। এরই মধ্যে ট্রাম্পের তিনটি টুইটকে বিরোধপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে টুইটার। নির্বাচনের দিনের পর প্রাপ্ত ভোট গণনা না করতে ট্রাম্প যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে ক্ষুব্ধ রিপাবলিকান দলের শীর্ষ নেতারাও। এমনকি তার প্রচারণা টিম বলছে, কিছু রাজ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জয়ের পথেই রয়েছেন। তারপরও সব ভোট গণনার বিপক্ষেই রয়েছেন ট্রাম্প।

রিপাবলিকানদের অভিযোগ নাকচ বাইডেন শিবিরের

মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া ও উইসকনসিনে ভোট গননা বন্ধে মামলা করেছে রিপাবলিকানরা। কিন্তু পেনসিলভেনিয়ায় ভোট গননা চলছে। নেভাডার রিপাবলিকান পার্টিও বলছে যে ভোট জালিয়াতির অভিযোগে তারা মামলা করতে যাচ্ছে। তাদের দাবি, প্রায় ১০ হাজার লোকের ভোট পড়েছে যারা ঐ অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দাই না। সম্প্রতি একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে দৃশ্যত ৮০টি ব্যালট পত্র একটি ব্যাগে ঢুকিয়ে তার ওপর তেল ঢেলে তা জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ভিডিওটি শেয়ার করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছেলে এরিক। তবে ভার্জিনিয়া বিচ শহরের কর্মকর্তারা এ নিয়ে ভোটের দিনেই এক বিবৃতি প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে ব্যালট পত্রগুলোতে কোন সরকারি ছাপ ছিল না এবং সেগুলো ছিল ব্যালট পত্রের নমুনা। ভার্জিনিয়া বিচ শহরের মেয়র নিজেও রিপাবলিকান। গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্জিয়ার এক বিচারক রাজ্যে অনুপস্থিত ব্যালট নিয়ে ট্রাম্পের প্রচারণা শিবিরের করা মামলা বাতিল করে দিয়েছেন। নির্বাচনী কর্মকর্তারা জর্জিয়ায় অবৈধ ব্যালট গণনা করার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের প্রচারণা শিবির এমন যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করছিল। যখন ওই দাবি প্রমাণের জন্য চাপ দেওয়া হয়, তখন অবশ্য তারা কিছু দাখিল করতে পারেনি।

বাইডেনের প্রচার দলের মুখপাত্র জেন ও’ম্যালি ডিলন অভিযোগ করেন, ট্রাম্প টিম মামলা দায়ের করার এক ব্যর্থ কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এসব মামলা হলো এখন যা অবশ্যম্ভাবী তাকে ঠেকিয়ে রাখার এক প্রচেষ্টা। বাইডেনই হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি এন্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপের (ওএসসিই) একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক টিম বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন। এতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।