মো. শাহ জালাল মিশুক
আসন্ন শীতে করোনার ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ আসতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে চলেছেন। এ কারণে আগাম সতর্কতা হিসেবে নতুন করে এই নির্দেশনা এসেছে সরকারের দিক থেকে। মাস্ক না পরলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সেবা দেওয়া হবে না—এই যে নির্দেশনা, তার মধ্যে দিয়ে মূলত সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাট-বাজার, শপিং মল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও ধর্মীয় সম্মেলনে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
‘মাস্ক পরি না তার একটা কারণ আমার গরম লাগে, আর করোনা তো চলে গেছে।’—বলছিলেন একজন মুদি দোকানদার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর দোকান খোলা থাকে এবং এই পুরো সময়টাই তিনি মাস্ক না পরে দোকানদারি করেন, প্রতিদিন কয়েক শ ক্রেতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। এভাবেই করোনা ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে অসচেতন মানুষজনের চলাফেরা সর্বত্র। শুধু মুদি দোকানদার নন, বাসের হেল্পার ও সুপারভাইজার, সিএনজি চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য মানুষ অসচেতনতা এবং অগ্রাহ্যের কারণে বেশ বড় ধরনের করোনা ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
মাস্ক পরা নিয়ে বিশ্ব পরিসংখ্যান কী বলছে? আগষ্টের শুরুতে এক গবেষণায় উঠে এসেছে, সপ্তাহে মাথাপিছু মৃত্যুর হার সেই অঞ্চলগুলোতে চার ভাগ কম, যেখানে মাস্ক পরার রীতি প্রচলিত আছে। গবেষকরা দৃষ্টি দিয়েছিলেন ২০০টি দেশের দিকে। যেখানে মঙ্গোলিয়ায় জানুয়ারিতে মাস্ক পরার রীতি চালু করেছিল। সেখানে মে মাসে এসেও কোভিড-১৯ সম্পর্কিত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। আরেকটি গবেষণা দৃষ্টি দিয়েছিল এপ্রিল ও মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মাস্ক পরার নির্দেশনার দিকে। গবেষকদের হিসাবমতে, এর ফলে দিনপ্রতি কোভিড-১৯ হ্রাস পেয়েছিল ২ শতাংশ পর্যন্ত। আরো দেখা গেছে, মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক নয় এমন দেশে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর হার প্রতি সপ্তাহে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক এমন সব দেশে করোনায় মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ বেড়েছে ২.৮ শতাংশ পর্যন্ত। পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বহু আক্রান্ত রোগী উপসর্গ ছাড়া ও মাস্ক ছাড়া আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তারা এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। কাজেই যতই সতর্কতা অবলম্বন করা হোক না কেন, মাস্ক না পরলে অনেকাংশেই আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
গত মার্চ মাসে দেশে করোনা রোগীর সন্ধান পাওয়ার পরে স্বাস্থ্যবিধি মানা ও মাস্ক পরার ওপরে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এমন কার্যক্রম নেই বললেই চলে। পাশাপাশি সেসময়ের মতো অফিস-আদালত ও গণপরিবহন বন্ধ নেই। অর্থনীতি ও জনগণের জীবিকার স্বার্থে পুরো দেশ অনেকটাই স্বাভাবিক। ফলে আসন্ন শীতে ইউরোপ-আমেরিকার মতো নতুন করে ব্যাপকহারে করোনার সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
মহামারি করোনাভাইরাসের বিস্তার কমাতে বাংলাদেশ সরকার এবার ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’, অর্থাত্ মাস্ক পরিধান ছাড়া কাউকে কোনো সেবা দেওয়া হবে না বলে নির্দেশনা জারি করেছে। জনগণের সদিচ্ছা ছাড়া শুধু নির্দেশনা জারি করে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা বেশ কঠিন। তাই সরকারের পাশাপাশি জনগণকে আন্তরিক হয়ে বাসার বাইরে সর্বত্র মাস্ক পরতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে জীবন-জীবিকার নানা কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে। তাহলেই হয়তো ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে করোনাভাইরাসের এই মহামারি।
সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
