সবুজ ফিরছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২০, ২২:২৩

প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে লম্বাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। গাছপালা কেটে উপরে একটি ছাউনি দিয়ে কোনোরকমে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু সূর্য ওঠার পরে ঐ ছাউনির তলে আর টিকে থাকতে পারলাম না। প্রচণ্ড গরমে ছেলেমেয়েগুলো ছটফট করতে লাগল। ভাত রান্না করার জন্য আমার স্ত্রী রহিমা চুলায় আগুন দিয়ে বলেছিল, এভাবে জীবন কাটানো যাবে না। এখানে গাছ রোপণ করতে হবে। মাত্র তিন বছরে ডব্লিউএফপির অর্থায়নে এনজিও সংস্থা সুশীলনের ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি সহায়তায় প্রকৃতির সাজে সজ্জিত হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। রোহিঙ্গাদের অনেকেই বললেন, যদি জানতাম গাছপালার জন্য পরিবেশগত উন্নয়নে ক্যাম্পে শান্তির সু-বাতাস বইবে তাহলে গাছপালা কাটতাম না।

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উখিয়া টেকনাফে ৮ হাজার ১৬৩ একর বনভূমি রোহিঙ্গারা উজাড় করেছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গারা জ্বালানি চাহিদা মেটাতে ৪ হাজার ২৭ একর সৃজিত বনভূমি ধ্বংস করেছে। আর বসতি স্থাপন করতে গিয়ে ৪ হাজার ১৩৬ একর জমি ন্যাড়া করে দিয়েছে।

সম্প্রতি মধুরছড়া, লম্বাশিয়া ঘুরে দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের বাড়ির আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ। জানতে চাওয়া হলে ক্যাম্প ৮ডব্লিউর বাসিন্দা আলম শাহ (২৮) জানান, প্রকৃতি জেগে উঠেছে। গত তিন বছরে আমরা প্রচণ্ড তাপমাত্রায় যা কষ্ট পেয়েছি এখন তা আর মনে পড়ে না। মনে হয় যেন সরকারের হাতে গড়া একটি পর্যটন পরিবেশ। ঐ রোহিঙ্গা আরো জানান, রোহিঙ্গারা উত্সাহিত হয়ে গাছ লাগিয়েছে এবং তা সংরক্ষণ করায় গাছগুলো দ্রুত বেড়ে উঠে ছায়া দিতে সক্ষম হয়েছে। যা ভোগ করছে এখানকার বাসিন্দারা। তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছে মানবজাতির জন্য প্রকৃতির অবদান।

ক্যাম্প ৮ডব্লিউর হেড মাঝি আব্দুল হাই বলেন, এখন পরিবেশ উন্নয়নের ফলে প্রাণভরে শ্বাস-নিঃশ্বাস নিতে পারছি। তিনি বলেন, ক্যাম্পে রোগব্যাধি পর্যন্ত কমে গেছে। এখন এক ইঞ্চি পরিমাণও খালি জায়গা থাকবে না। রোহিঙ্গারা থাক আর না থাক সেটা বড় কথা নয়। তবে তাদের রোপণ করা গাছগুলো এক দিন সাক্ষী হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, গাছ উন্নয়নের নেপথ্যে এনজিও সংস্থাগুলোর অবদান অস্বীকার করা যায় না। কেননা তারা যদি ঘরে ঘরে গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ না করত তা হলে রোপণ করা গাছ দিয়ে জ্বালানি হিসেবে রান্নাবান্নার কাজ করত রোহিঙ্গারা।

পরিবেশের উন্নয়ন নিয়ে ১৮ ঘণ্টা কাজ করছেন এনজিও সংস্থা সুশীলনের সিনিয়র ফরেস্ট অফিসার মো. ফারহান হক। তিনি বলেন, মূলত তিনি কাজ করছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিবেশের উন্নয়নের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও পাখির কলকাকলি সৃষ্টির জন্য। ফাঁকা জায়গায় প্লট আকারে গাছ রোপণ করা হচ্ছে। এভাবে শতাধিক প্লটে ১ কোটির ওপরে গাছের চারা উত্পাদন করা হয়েছে। এসব রোহিঙ্গার মধ্যে সরবরাহ করা হবে। তারা যেন গাছগুলো রোপণ করে ক্যাম্পের পরিবেশ পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়। 

রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৮ডব্লিউ, ক্যাম্প-৫ ও ক্যাম্প ১৭-এর ইনচার্জ হাফিজুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গাছপালা উঠার কারণে ক্যাম্পের পরিবেশের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ক্যাম্প এলাকায় হেঁটে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তিনি বলেন, ক্যাম্পে গাছ রোপণের জন্য রোহিঙ্গাদের অনেক চাপ প্রয়োগ করতে হয়েছে। যাকে যেভাবে পারি সেভাবে ম্যানেজ করে গাছ লাগাতে সহায়তা করেছি। যে কারণে আজ রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় সবুজের সমারোহ।

উপজেলা বনরেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী তরিকুল ইসলাম বলেন, এনজিও সংস্থার সহায়তায় রোহিঙ্গাদের সামগ্রিক উদ্যোগে ক্যাম্পগুলো সবুজায়ন হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে এ উদ্যোগ সহায়ক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।