গত কয়েক মাসে ইউরোপ জুড়ে করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির ফলে অর্থনীতিতে গতি ফিরছিল। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আদেশও বাড়তে শুরু করে। কিন্তু নতুন করে ইউরোপ জুড়ে করোনার প্রকোপ বাড়তে শুরু করায় যুক্তরাজ্য, স্পেন, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসে ফের লকডাউন (অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা) শুরু হয়েছে। আবার ইতালি, জার্মানিতে কিছু ক্ষেত্রে কার্ফু জারি করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ফের হোঁচট খাচ্ছে। এই সময়ে যেসব রপ্তানি আদেশ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা, তার উল্লেখযোগ্য অংশই স্থগিত হয়ে গেছে বলে রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন। ফলে আগামী মাসগুলোতে ফের রপ্তানি কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, গত জুন থেকে রপ্তানি কিছুটা বাড়তির দিকে থাকলেও অক্টোবরে এসে ধাক্কা খেয়েছে। আলোচ্য সময়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে গেছে চার শতাংশেরও বেশি। অথচ এর আগের মাসগুলোতে রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল।
এমন ডামাডোলের মধ্যেই সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খ্যাতনামা ব্র্যান্ড গ্যাপ জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে তারা তাদের সব স্টোর বন্ধ করে দেবে। একই সঙ্গে ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড এবং ইতালির স্টোরও আগামী গ্রীষ্ম নাগাদ বন্ধ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তারা। এর আগেই জেসি পেনিসহ কয়েকটি নামকরা ব্র্যান্ড দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আবেদন করেছে। অনেক ব্র্যান্ডই তাদের স্টোর বন্ধ করে খরচ কমিয়ে আনতে চাইছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচএন্ডএম কিছু স্টোর বন্ধ করার পথে হাঁটছে। ফলে সবমিলিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে রপ্তানিকারকদের।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক ইত্তেফাককে বলেন, আমরা উদ্বিগ্ন। সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। করোনার পর গত দুই তিন মাস রপ্তানি পরিমাণে কিছুটা বাড়লেও দাম কমে গিয়েছিল দুই থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু পশ্চিমের দেশগুলোতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর ক্রেতারা ক্রয়াদেশ স্থগিত করে দিতে পারে। এর ফলে আগামীতে রপ্তানি কমে যেতে পারে। কারখানাগুলোকে ফের হয়তো অলস বসে থাকতে হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সত্যিই কঠিন হয়ে যাবে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, একসময় ইউরোপ আমেরিকার ক্রেতারা প্রতি সিজনেই নিত্য নতুন ডিজাইনের পোশাক কিনতেন। কিন্তু করোনায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এখন পোশাক পণ্যের চাইতে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী হয়েছেন। এ কারণেও পোশাকের চাহিদা কমতির দিকে।
অন্তত ১০ জন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউরোপ জুড়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে তাদের নতুন রপ্তানির দরাদরির আলোচনা (নেগোসিয়েশন) স্থগিত হয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের এমবি নিট ফ্যাশন্সের মালিক ও বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে যেসব রপ্তানি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা, তা আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে।
বিজিএমইএর পরিচালক ও এডামস অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান শহীদুল হক মুকুল ইত্তেফাককে বলেন, ক্রয়াদেশ নিয়ে কথা বলতে গত তিন নভেম্বর ফ্রান্সের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও তা স্থগিত করেছে। একই কথা জানিয়েছেন ক্লাসিক ফ্যাশনের মালিক ও বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম। গত কয়েক মাসে রপ্তানিতে যে গতি তৈরি হয়েছিল, তা স্থগিত হয়ে গেছে।
গত মার্চ থেকে বিশ্বব্যাপী করোনা বাড়তে থাকায় কমতে শুরু করে রপ্তানি। ইপিবির দেওয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) রপ্তানি কমেছে ৬৮৬ কোটি মার্কিন ডলারের, যার পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার। তবে জুলাই থেকে রপ্তানি কিছুটা বাড়তে থাকে। জুলাইয়ে রপ্তানি পূর্বের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য বাড়লেও আগস্টে এসে চার দশমিক ৩২ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে তিন দশমিক ৫৩ শতাংশ বাড়ে। অবশ্য এর পরের মাস অক্টোবরে কমে যায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত মার্চ থেকে আটকে থাকা পণ্য পরবর্তীতে নেওয়ার কারণে ঐ সময়গুলোতে রপ্তানি বেড়েছে বলে দেখা গেছে।
অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই বলে মনে করছেন কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ। তৈরি পোশাক খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, করোনার কারণে রপ্তানি গন্তব্যে দোকান বন্ধ থাকলে পরের মাসগুলোতে রপ্তানি কিছুটা কমার শঙ্কা রয়েছে। তবে হঠাত্ করে কমে যাবে না। করোনায় অতীতে যেই গতিতে রপ্তানি হয়েছিল, তা থাকবে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব খুব বড় হবে না।
এদিকে উদ্যোক্তাদের মধ্যেও কেউ কেউ আশার কথা শুনিয়েছেন। অন্যতম বড় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ভিয়েলাটেক্সের চেয়ারম্যান ডেভিড হাসনাত ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতারা নেগোসিয়েশনের সময় পিছিয়ে দিচ্ছেন, সত্য। কিন্তু তারা তা বাতিল করছেন না। বাংলাদেশ যেহেতু অপেক্ষাকৃত কম দরের এবং প্রয়োজনীয় পোশাক বেশি রপ্তানি করে, ফলে আমাদের পণ্য তাদের প্রয়োজন হবেই।
