অষ্টম শ্রেণির অ্যাসাইনমেন্টের নমুনা:বাংলা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২০, ১৯:২৪

মো. আতাউর রহমান সায়েম

সিনিয়র সহকারী শিক্ষক, বাংলা বিভাগ

স্নেহের শিক্ষার্থীবৃন্দ, তোমরা নিশ্চয়ই জেনেছ যে, কোভিড-১৯ ভাইরাসের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তাই সম্প্রতি মাউশির নির্দেশনায় তোমরা বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্টের কাজ সম্পর্কে জানতে পেরেছ। তোমাদের অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের প্রথম সপ্তাহে একটা নির্ধারিত কাজের শিরোনাম হচ্ছে- মনে করো, তোমরা কোনো স্থানে শিক্ষা সফরে গেছ এবং সেখানে কী কী দেখেছ- এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা দিয়ে হাতে লিখে একটা অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করতে হবে। প্রথমে তোমরা কিছু এ-ফোর কাগজ, কয়েকটি কালো কলম ও সাইনপেন  কিনবে। প্রত্যেক পৃষ্ঠায় ভালো করে মার্জিন দিবে। উভয় পৃষ্ঠায় লেখা যাবে না। শুরুতেই কাভার পেজে তোমাদের প্রতিষ্ঠানের নাম (প্রতিষ্ঠানের লগো না দিলেও হবে), নির্ধারিত কাজের শিরোনাম, বিষয়, তোমার পরিচয়, মূল্যায়নকারী শিক্ষকের পরিচয়, জমাদানের তারিখ লিখবে এবং পরের পৃষ্ঠায় শিক্ষা সফরের বর্ণনা পয়েন্ট দিয়ে লিখলে সূচিপত্র দিবে। আর যদি পয়েন্ট না দিয়ে প্যারা করে লেখো, তাহলে সূচিপত্র দিবে না। পরের পৃষ্ঠায় ঐ শিরোনাম লিখে নিম্নের নমুনা অনুসরণ করতে পার।

নমুনা অ্যাসাইনমেন্ট— ১

 

শিরোনাম:শিক্ষা সফরে পাহাড়পুর

বিষয়:বাংলা

 

উপস্থাপনায়

প্রিয়ন্ত পাল

শ্রেণি:অষ্টম

শাখা:আই

ক্রমিক নম্বর:০১

মতিঝিল ইংলিশ ভার্সন (দিবা শাখা)

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা— ১০০০

 

তত্ত্বাবধায়ক

মো. আতাউর রহমান সায়েম

সিনিয়র সহকারী শিক্ষক

বাংলা বিভাগ

মতিঝিল ইংলিশ ভার্সন (দিবা শাখা)

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা— ১০০০

 

জমাদানের তারিখ:  ১১ নভেম্বর ২০২০ খ্রি:

 

শিক্ষকের মন্তব্য

সূচিপত্র

ভূমিকা

শিক্ষা সফরের গুরুত্ব

দেশভ্রমণ ও শিক্ষা সফরের পার্থক্য

শিক্ষা সফরের উপযোগী স্থান

শিক্ষা সফরে পাহাড়পুর

পাহাড়পুরে গিয়ে যা যা দেখলাম ও জানলাম

সুপারিশমালা

উপসংহার

শিক্ষা সফরে পাহাড়পুর

 

ভূমিকা:‘দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু

দেখা হয়নি চক্ষু মিলিয়া

ঘর হতে শুধু দু পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপর

একটি শিশির বিন্দু।’

— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

ভ্রমণ মানুষকে কূপমণ্ডুকতার ছত্রছায়া থেকে মুক্ত করে বিশাল পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যের মধ্যে ঠাঁই দেয়। মানুষের মনকে করে তোলে উদার। ক্ষুদ্র এ মানবজীবনকে দান করে গতিশীলতা। আর সেই ভ্রমণ যদি হয় শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে, তাহলে তো কথাই নেই। আমাদের এ শিক্ষা সফরের বিবরণী হয়তো বিখ্যাত রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর বিভিন্ন ভ্রমণকাহিনির মতো নয়; কিংবা অপরাজেয় কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অতিথির স্মৃতি’ গল্পের ভারতের ঝাড়খণ্ড প্রদেশের দেওঘরের মতো ভ্রমণকাহিনি নয়। তবে সম্প্রতি মাউশি থেকে পাঠানো নির্দেশনায় অষ্টম শ্রেণির বাংলা বিষয়ের আলোকে আমাদের শিক্ষা সফরের বেশ কিছু তথ্য ও অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করছি মাত্র।

 

শিক্ষা সফরের গুরুত্ব:শিক্ষা সফরের মাধ্যমে মানুষের অসম্পূর্ণ ও আবদ্ধ জ্ঞান বিকাশ লাভের সুযোগ পায়। শিক্ষা সফর একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনকে করে আনন্দময় ও পরিপূর্ণ। শিক্ষা সফরের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সুযোগ পায় নিজের দেশ ও জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তথা নিজের শেকড় সম্পর্কে জানতে। আমরা এ পৃথিবীর অনেক কিছুই জানি না। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঐকতান’ কবিতার ভাষায়— ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।’ তাই নতুন কিছু জানার জন্য, শেখার জন্য, এমনকি একঘেয়েমি দূর করার জন্য শিক্ষা সফরের গুরুত্ব অনেক। কারণ শিক্ষা সফরে শুধু আনন্দই হয় না, অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন স্বচক্ষে দেখতে পাওয়া যায় এবং জ্ঞান আহরণ করা যায়।

 

দেশভ্রমণ ও শিক্ষা সফরের পার্থক্য: আটপৌঢ় জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে অনেক মানুষ ভ্রমণ করে দেশ দেশান্তরে। দেশভ্রমণ তাদের কাছে বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু শিক্ষা সফর নিছক সময় কাটানো কিংবা বিনোদনের উদ্দেশ্যে করা হয় না। শিক্ষাসফরের প্রধান উদ্দেশ্য পাঠ্যসূচি সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন, অজানা পৃথিবীর বিচিত্র রূপ প্রত্যক্ষ করা। তাই দেশভ্রমণ ও শিক্ষাসফর এক কথা নয়। তবে দেশে কিংবা দেশের বাইরে সফরের মাধ্যমে নানান জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হওয়া যায় যা জ্ঞানের সীমাকে প্রসারিত করে।

 

শিক্ষা সফরের উপযোগী স্থান: শিক্ষা সফরের জন্য এমন স্থান নির্বাচন করা উচিত যা হবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনে সহায়ক। বাংলাদেশে এরূপ অনেক স্থান আছে যেগুলো শিক্ষা সফরের উপযোগী। এদেশে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার যা বিশেষ করে ভূগোল ও মত্স্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এ  স্থান অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। এখানে তারা বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী, সামুদ্রিক পরিবেশ ও মত্স্য বিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে জ্ঞান লাভ করতে পারে। সুন্দরবন উদ্ভিদ বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, সিলেটের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ উপভোগ করার জন্য প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী এ সকল স্থানে আগমন করে। নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর, বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার ময়নামতির বৌদ্ধ সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন। তাছাড়াও ছোটো ছেলেমেয়েদের দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও অতীত ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত করাতে নিয়ে যাওয়া যায় বিভিন্ন জাদুঘরে।

 

শিক্ষা সফরে পাহাড়পুর:গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগত কারণে ইতিহাসে মর্যাদা পাওয়া যে কয়টি স্থান বাংলাদেশে রয়েছে তার মধ্যে পাহাড়পুর অন্যতম। তাই আমরা ২০২০ সালে  ফেব্রুয়ারি মাসে ০২ তারিখে অষ্টম শ্রেণির ছাত্ররা এবং আমাদের বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও অফিসের কর্মচারী সকাল ৬ টায় ঢাকা থেকে বাসে করে শিক্ষা সফরে পাহাড়পুরে গিয়েছিলাম। পাহাড়পুর বিহারটি বর্তমান রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার ‘পাহাড়পুর’ গ্রামে অবস্থিত। এর আরেক নাম ‘সোমপুর বিহার’ বা ‘সোমপুর মহাবিহার’। এটি বাংলাদেশের এমনকি দুনিয়ার একটি বিখ্যাত স্থান। যা মূলত একটি সুপ্রাচীন বৌদ্ধবিহার এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে ভরপুর।

 

পাহাড়পুরে গিয়ে যা যা দেখলাম ও জানলাম: আমরা পাহাড়পুরে দুপুর ১২ টায় পৌঁছার পর বিভিন্ন সাইনবোর্ডে লেখা দেখলাম এবং জানতে পারলাম যে, আজ থেকে প্রায় ১৪শ বছর আগে পাহাড়পুর বিহারটি নির্মাণ করা হয়। রাজা দ্বিতীয় ধর্মপাল এটি নির্মাণ করেছিলেন। দীর্ঘকাল পরে ১৮৭৯ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম এটি আবিষ্কার করেন। আমাদের শ্রেণি শিক্ষক আতাউর স্যারের কাছে আরও জানতে পারি যে, যুগ যুগ ধরে উড়ে আসা ধুলোবালি ও মাটি এর চারদিকে জমতে থাকার কারণে এক সময় মাটির স্তূপে ঢাকা পড়ে এটি পাহাড়ের মতো হয়ে যায়। সেই থেকে এর নাম হয়ে যায় ‘পাহাড়পুর’।

 

অন্যান্য পর্যটকদের মতো আমরাও জ্ঞান আহরণের জন্য এর চারপাশে ঘুরতে থাকি। কিছুদূর যেতেই ওখানকার একজন কর্মচারীর দেখা পাই এবং তিনি আমাদেরকে অনেক তথ্য জানান। সুপ্রাচীন এ বিহার এলাকাটি প্রায় ৪০ একর জায়গা জুড়ে লালচে মাটির ভূমিতে বিস্তৃত। ২৭ একর জমির উপর এর বিশাল দালান। এর নির্মাণশৈলীও অসাধারণ। মাটির নিচের অংশে এটি চারকোণা আকারের। বাইরের দেয়ালের গায়ে পোড়ামাটি দিয়ে নানা রকম ফুল-ফল, পাখি, পুতুল, মূর্তি ইত্যাদি বানানো আছে। উত্তর দিকের ঠিক মাঝখানে মূল দরজা। তারপরেই রয়েছে অনেকগুলো ছোট—বড় হলঘর। দেয়ালের ভেতরে সুন্দর সারি বাঁধা ১৭৭টি ছোট ছোট ঘর। সামনের দিকে আছে লম্বা বারান্দা। বিহারটিতে আরও আছে পুকুর, স্নানঘাট, কূপ, স্নানঘর, রান্নাঘর, খাবার ঘর ও টয়লেট। সব মিলিয়ে বিহারটিতে ৮০০ মানুষের থাকার ব্যবস্থা ছিল।

এছাড়া আরও কিছু দর্শনীয় স্থাপনা দেখতে পেলাম। বিহারের ভিতর বিশাল উঠানের মাঝখানে বড় এক সুন্দর মন্দির। ধাপে ধাপে উঁচু করে বড় মন্দিরটা বসানো হয়েছে। পোড়ামাটির দুই হাজার ফলকের চিত্র দিয়ে মন্দিরের বাইরে আর ভেতরে সাজানো। একই রকম ছোটছোট মন্দির পুরো বিহারের নানান জায়গায় আছে। বিহারটির পূর্ব-দক্ষিণ কোণে দেয়ালের বাইরে একটা বাঁধানো ঘাট আছে। ওটাকে বলা হয় ‘সন্ধ্যাবতীর ঘাট’। পাহাড়পুর বিহারের পাশে আছে দেখার মতো একটা জাদুঘর। সেখানে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা আছে খনন করে পাওয়া অনেক পুরাতন আর দুর্লভ জিনিসপত্র। এই এলাকার একটু দূরেই আছে ‘সত্যপীরের ভিটা’। সেখানে অনেকেই ভক্তিভরে প্রার্থনা করে, মানত করে।

 

সুপারিশমালা:  বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসে পাহাড়পুর এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এটি ছিল বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। এখানে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও হোটেল-মোটেল স্থাপন করে আধুনিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন আরো অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে পুলিশ আনসার থাকতে হবে। তাহলেই ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এজন্য সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।

 

উপসংহার:  শিক্ষা সফর শিক্ষার অন্যতম একটি অংশ। বই থেকে অর্জিত জ্ঞান অন্তরে ধারণ করে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরে যায় সে অর্জিত জ্ঞান প্রত্যক্ষ করতে। বইয়ের পড়া আর চোখের দেখা— এ দুইয়ে মিলে পরিপূর্ণভাবে আলোকিত হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীর অন্তর্লোক। শিক্ষা সফর শিক্ষার্থীদের যেমন মুক্তি দেয় লেখাপড়ার একঘেয়েমি থেকে, তেমনি তাদের পুস্তকলব্ধ জ্ঞানকে দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব প্রদান করে। শিক্ষা সফরে গিয়ে বিশাল পৃথিবীর অপরিমিত সৌন্দর্য অবলোকনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করারও সুযোগ পায়। যেমনটি আমরা পেয়েছিলাম প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাহাড়পুরে শিক্ষা সফরে গিয়ে? আমাদের সকলেরই উচিত একবারের জন্য হলেও পাহাড়পুর ঘুরে আসা। কারণ পাহাড়পুর ভ্রমণে শুধু আনন্দই হবে না, অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন স্বচক্ষে দেখতে পাব এবং জ্ঞান আহরণ করতে পারব।

তথ্যপঞ্জি:

১. ড. শাহজাহান তপন, থিসিস ও অ্যাসাইনমেন্ট লিখন পদ্ধতি ও কৌশল, প্রতিভা, ইস্টার্ন প্লাজা, ঢাকা, ১৯৯৩

২. শামসুজ্জামান খান (সম্পা.): বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা নওগাঁ জেলা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৬

৩. বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদন।

৪. https//www.paharpurhistoricalplace.org