‘প্রাণ-চঞ্চল প্রাচীর তরুণ, কর্মবীর, হে মানবতার প্রতীক গর্ব উচ্চশির’ তারুণ্যের এই প্রশস্তি চিরতরুণ কবি নজরুলের কণ্ঠে। দেশ এবং জাতি যখনই কোনো সংকটের মুহূর্তে পৌঁছাইয়াছে, তখনই আগাইয়া আসিয়াছে এই তরুণ যুবসমাজ। দেশের ক্রান্তিকালে নিজেদের জীবন বাজি রাখিয়া তাহারা ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে দেশ, মানুষ এবং আর্তমানবতার সেবায়।
বাংলাদেশে করোনা মহামারি প্রকট আকার ধারণ করিয়াছিল মার্চ মাস হইতেই। শুরুতে এই মরণব্যাধি লইয়া মানুষের মনে কাজ করিয়াছে আতঙ্ক আর ভয়। ভীতি অবশ্যম্ভাবী—ইহা এমনই এক মহামারি, যাহার কোনোরূপ চিকিত্সা আজ অবধি আবিষ্কার হয় নাই। সমগ্র বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও উল্লেখযোগ্য হারে মানুষ ভুগিয়াছে করোনার জটিলতায়, মারা গিয়াছে অনেকেই। এই সময় অক্সিজেনের চাহিদা প্রকট হইয়াছে, প্রয়োজন পড়িয়াছে প্লাজমার। অক্সিজেন আর প্লাজমার অভাবে যখন চিকিত্সায় বঞ্চিত হইতেছিল সাধারণ মানুষ, সেই সময় নজরুলের তারুণ্যের দীক্ষায় দীক্ষিত হইয়া মানবতার দূতরূপে তাহাদের পাশে আসিয়া দাঁড়ায় একদল তরুণ। করোনা সংক্রমণে অক্সিজেনের অভাবে মানুষ যখন ভুগিতেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ অভিনব এবং প্রশংসনীয় এক উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছেন। তাহারা বিনা মূল্যে মানুষের দ্বারে দ্বারে অক্সিজেন পৌঁছাইয়া দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলিয়া নিয়াছেন। ‘জয় বাংলা অক্সিজেন সেবা’ নামে পরিচালিত এই উদ্যোগ শুরুতে রাজধানী ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকিলেও ক্রমেই তাহা বিস্তার লাভ করিয়াছে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ফেনী, লক্ষ্মীপুরসহ দেশের আরো অনেক জেলায়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যাহাতে অক্সিজেন হইতে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যে উদ্যোক্তারা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও সমগ্র দেশে অক্সিজেন পৌঁছাইয়া দেওয়ার চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে। সাধারণ রোগীরাও তাহাদের যথাসাধ্য সহযোগিতা করিয়া থাকে, অক্সিজেনের অভাব পূরণের পর তাহারা সময়মতো অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছাইয়া দেয় উদ্যোক্তাদের নিকট। নিঃসন্দেহে এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ আমাদের আশাবাদী করিয়া তোলে। করোনা বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে যখন প্রতিটি রোগীর সুচিকিত্সা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জের বিষয়, তখন তরুণ যুবকদের এ ধরনের মানবিক উদ্যোগকে আমরা হূদয় হইতে সাধুবাদ না জানাইয়া পারি না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা আরেকটি মহত্ উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। করোনা চিকিত্সায় প্লাজমা থেরাপি অধিক জনপ্রিয় হইয়া উঠে; কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মুমূর্ষু রোগীর পরিবারের জন্য প্লাজমা সংগ্রহ করাটা বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছিল। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণরা গড়িয়া তুলিয়াছে প্লাজমা ব্যাংক। জরুরি মুহূর্তে মুমূর্ষু রোগীদের কোন উপায়ে প্লাজমা সংগ্রহ করিয়া দেওয়া যায়—ইহাই ছিল তাহাদের উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য পূরণে স্বেচ্ছাসেবকরা সুস্থ রোগীদের তালিকা প্রস্তুত করিয়া তাহাদের নিকট হইতে প্লাজমা সংগ্রহ করিয়া থাকে। অনলাইনভিত্তিক এই প্লাজমা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর হইতে তাহারা বহু রোগীকে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে প্লাজমার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে। এ ধরনের মানবিক উদ্যোগসমূহ করোনা পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষকে অভূতপূর্ব সেবা প্রদান করিয়াছে।
দেশের ক্রান্তিকালে যেই সকল তরুণ ব্যক্তি উদ্যোগ কিংবা দলগত উদ্যোগে মানুষের পাশে যাইয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহারাই তো একদিন দেশকে নেতৃত্ব দিবে। তাহাদের এই মানবিক মূল্যবোধে উপকৃত হইবে দেশ-জাতি এবং সমাজ। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষেরও উচিত হইবে দায়িত্ববোধের জায়গা হইতে এই সকল উদ্যোমী তরুণের পাশে দাঁড়ানো।
