সেতুর নামকরণ প্রসঙ্গ

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৩

এম এইচ রহমতুল্লাহ

আশা করা যায়, ২০২১ সালের প্রথমার্ধেই পদ্মা নদীর ওপর নির্মীয়মান দেশের বৃহত্তম বহুমুখী সেতুটি চালু হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই করোনাজনিত সংকট পাশ কাটিয়ে ৩৬টি স্প্যান বসানো সম্পন্ন হয়েছে। মাত্র পাঁচটি স্প্যান বসতে বাকি। কথা আছে, ডিসেম্বরের মধ্যেই সবগুলো স্প্যান বসানোর কাজ সম্পন্ন হবে। দুই স্তর বিশিষ্ট সেতুটিতে ওপরের স্তরে চার লেনের সড়ক এবং নিচের স্তরে থাকবে রেলপথ। বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে এহেন ব্যয়বহুল, কার্যকর ও উন্নতমানের সেতু নির্মাণ একটি যুগান্তরী ঘটনা! এই সেতু শুধু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশকে উত্তর-পূর্বাংশের সঙ্গে সংযুক্ত করবে তা-ই নয়, এটি এই দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, এমনকি সামাজিক ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আমার ধারণা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই  পদ্মা সেতু জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রায় একক কৃতিত্বের ফসল।

জননেত্রী শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, শ্রম এবং সদিচ্ছার ফলাফলই হচ্ছে ‘পদ্মা সেতু’। এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছেন। সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাংক রহস্যজনকভাবে শেখ হাসিনা সরকারের একজন সুদক্ষ মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ আনে এবং প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদানে বিরত থাকে। অন্য দাতারাও বিশ্বব্যাংকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। এ নিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের দেশি-বিদেশি দোসররা নানা ধরনের অপপ্রচারণায় লিপ্ত হয়। কিন্তু শেখ হাসিনা বুঝতে পারেন যে, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি এই সেতু নির্মাণে বাধা দেওয়ার লক্ষ্যেই এসব ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তিনি সব ধরনের বাধা-বিপত্তি অগ্রাহ্য করে দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে যান এবং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন! সত্যি কথা বলতে কি, তার এই ঘোষণা শুনেও অনেকে বিশ্বাস করেননি যে, নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের পক্ষে এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন জাতির জনকের সুযোগ্য তনয়া শেখ হাসিনা। সুতরাং সেতুর নামকরণে প্রথম নামটি আসা উচিত ছিল শেখ হাসিনার। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তিনি নাম প্রস্তাবের সারসংক্ষেপ থেকে তার নামটি নিজেই বাদ দিয়েছেন। এটি তার মহত্ত্ব। তবে জাতির জানা আছে, এই সেতুর প্রতিটি ইট-বালুর সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে।

তাই বলে তার এই মহত্ত্বের সুযোগ কি দুষ্টচক্রকে নিতে দেওয়া যায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সহযোগী দেশি-বিদেশি চক্র এখন সক্রিয় হয়েছে সেতুটির নামকরণের ব্যাপারে। সম্প্রতি তারা বিভিন্ন সময়ের খ্যাতিমান বিভিন্ন জনের নামে পদ্মা সেতুর নামকরণের দাবিতে মানববন্ধন করাতে চেষ্টা করছে। পেছন থেকে মদত দিয়ে দু-চার জন লোককে একটি ব্যানার হাতে নামিয়ে দিচ্ছে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। যাদের নাম সামনে আনতে চেষ্টা করছে তারা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বড় মানুষ। কিন্তু পদ্মা সেতুর নামকরণের জন্য তাদের নাম কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা ভেবে দেখার বিষয়। তারা আসলে এই দাবির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নাম সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে বলেই আমার ধারণা।

সেক্ষেত্রে  এই সেতুর নাম বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে হওয়াই বাঞ্ছনীয়, যিনি নেপথ্যে থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এদেশ স্বাধীনে নিরন্তর প্রেরণা জুগিয়েছেন। সেটা করতে গিয়ে পরিবার, ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে অমানবিক কষ্ট করেছেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে আমাদের দাবি—পদ্মা সেতুর নামকরণ করতে হবে বঙ্গমাতার নামে। শেখ হাসিনা এই প্রস্তাবে রাজি না হলে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে একটি সভা আয়োজন করে সেই সভায় এই সেতুর নাম দিতে হবে ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পদ্মা বহুমুখী সেতু’। এর বাইরে অন্য কারো নামে এই সেতুর নামকরণ করলে তা হবে কৃতঘ্নতার শামিল। পাহাড় ঠেলে সরানোর মতো যে কঠিন কাজ শেখ হাসিনা করেছেন তার কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশের একটি দায় কিন্তু জাতির আছে। 

n লেখক :সাবেক দুদক কর্মকর্তা