বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থা ও অনলাইন শিক্ষা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২০, ২১:৫৪

খন্দকার হাবীব আহসান

আমাদের দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করলে ১৭ মার্চের পর থেকে বন্ধ রয়েছে সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শুরুর দিকে শিক্ষার্থীরা আকস্মিক ছুটিতে সাময়িক আনন্দ বোধ করলেও বর্তমানে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে সিদ্ধান্তহীন ও অনিশ্চিত শিক্ষাযাত্রা। স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলেও পুনরায় প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করতে পারার সময়টা এখন অনিশ্চিত। যে কোনো উপায়ে এই সংকট দূর করে নিয়মিত পাঠদান ও পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের শিক্ষার্থীরা ‘প্যারেন্ট স্কুলিং’-এর সুবিধা পেলেও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা পড়ছে বিপাকে। তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কা এবং বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে বাল্যবিবাহের। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এসেছে ইতিমধ্যেই। তবে সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায় বিবেচনায় অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষকমণ্ডলীর পাঠদানের গুণগতমান এবং সব শিক্ষার্থীর জন্য ডিজিটাল ডিভাইস নিশ্চিতকরণ এক দারুণ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যক্ষ্মা মহামারি আকার ধারণ করলে শিক্ষাব্যবস্থা গতিশীল রাখতে প্রথম দিকেই ওপেন এয়ার স্কুল চালু করে জার্মানি ও বেলজিয়াম। পরবর্তীকালে খোলা মাঠ, ভবনের ছাদ ও সুবিধামতো ফাঁকা স্থানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে বিভিন্ন দেশ। টিকা আবিষ্কার ও সবার জন্য সহজলভ্য হওয়ার মধ্যে শিক্ষার গতিশীলতা ধরে রাখতে এমন পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। সময়ের পরিবর্তনে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার স্থবিরতা রোধ করেছে অনলাইন প্ল্যাটফরম। শিক্ষা পদ্ধতির এমন বিকল্প ব্যবস্থা উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিকল্পনায় যুগান্তকারী ধারণা। একবিংশ শতাব্দীর একদম শুরুর দিকেই যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শ্রেণিকক্ষের নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে অনলাইন ক্লাসরুম ব্যবস্থার প্রচলন ঘটিয়েছে। এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে সহজলভ্য করতে বিভিন্ন কোর্স সম্পূর্ণরূপে অনলাইনে চালু করেছে। সঙ্গত কারণে ঐ সব বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দেশের নিজস্ব গণ্ডি পেরিয়ে প্রকৃত অর্থেই বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে।

অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সর্বস্তরে নিশ্চিত করতে আমরা আমাদের দেশে যে কয়েকটি বাধার সম্মুখীন হচ্ছি তার মধ্যে অন্যতম দুটি সমস্যা হলো-অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত মানের ডিজিটাল ডিভাইসের অভাব ও দেশের সব জায়গায় স্বল্পমূল্যে মানসম্মত নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থার সংকট। এ দুটি সমস্যা সমাধানের যে চেষ্টা সরকার করছে সেটি সফল হলেই পরবর্তীকালে শিক্ষকদের পাঠদানের মানোন্নয়ন করতে পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক মানসম্মত ‘টিচিং ম্যাটেরিয়াল’ সরবরাহ প্রয়োজন। হোয়াইট বোর্ড অ্যানিমেশন, থ্রিডি স্টাডি কন্টেন্ট ও গ্রাফিক্স স্টাডি ম্যাটেরিয়াল অনলাইন শিক্ষাকে সহজবোধ্য করতে বেশ কার্যকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি অনলাইনে নিতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাটা একটা চ্যালেঞ্জ। আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্রে রাজধানীকেন্দ্রিক ট্রাফিক জ্যাম উপেক্ষা ও সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে শিক্ষাব্যবস্থার এই আধুনিকায়ন হবে বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ।

অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই নিয়মিত কার্যক্রম করতে হলে ডিজিটাল ডিভাইস ও এর বিবিধ অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারে পারদর্শী হওয়াটা প্রয়োজন। এই শিক্ষাটাও অনেকাংশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার মতো। সঙ্গত কারণে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের একদিকে যেমন শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করবে তেমনি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানের পদ্ধতি বৈশ্বিক মানে উন্নীত হয়ে বৈশ্বিক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। তবে অনলাইনে পরীক্ষা পদ্ধতির নতুন কৌশল নির্ধারণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করে অনলাইন-অফলাইন উভয় শিক্ষা পদ্ধতি যুগপত্ভাবে কার্যকর রাখতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সময়ের সঙ্গে চলতে পারবে। মহামারির সময়ে সংকট মোকাবিলায় বাধ্য হয়ে শিক্ষাব্যবস্থার পদ্ধতিগত এই পরিবর্তনের যদি মানসম্মত স্থায়ী রূপ দেওয়া যায়, তবে সেটিই হবে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানে এগিয়ে নেওয়ার দুর্দান্ত ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়