মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অর্ধেক হিসাবই নিষ্ক্রিয়

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২০, ২২:০৪

রেজাউল হক কৌশিক

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। ফলে নতুন করে গ্রাহকও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। তবে নতুন নতুন গ্রাহক এ সেবাভুক্ত হলেও বড় অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব মতে, দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক প্রায় সাড়ে ৯ কোটি। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি হিসাবই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) গাইডলাইন অনুযায়ী, কোনো একটি হিসাবে টানা তিন মাসে যদি একবারও লেনদেন করা না হয় তাহলে সেই হিসাবকে নিষ্ক্রিয় হিসাব হিসেবে ধরা হয়। তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৩৭ লাখ ৫২ হাজার। যেখানে এ সময়ে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৪৭ লাখ ৮৭ হাজার। অর্থাত্ সক্রিয় গ্রাহকের সংখার চেয়ে নিষ্ক্রিয় গ্রাহকসংখ্যা অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এমন চিত্র দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনেকেই একটি নির্দিষ্ট উপলক্ষ্যকে সামনে রেখে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলেন। অনেকে আবার উত্সব-পার্বণে আত্মীয়স্বজনদের কাছে টাকা পাঠাতে অ্যাকাউন্ট খোলেন। কেউবা আবার কোনো নির্দিষ্ট বিল দেওয়া যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, সরকারি ভাতা গ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে অ্যাকাউন্ট খোলেন। এরপর আপাতত আর দরকার না হওয়ায় কারণে তা নিষ্ক্রিয় হিসেবে গণ্য হয়। তবে এর মধ্যে অনেকেই আবার ফিরে আসেন। নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট বিষয়ে বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম ইত্তেফাককে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নতুন নতুন সেবা যুক্ত হচ্ছে। আগে শুধু টাকা পাঠানো ও উঠানোর মধ্যেই একজন গ্রাহক সীমাবদ্ধ ছিলেন। ফলে এখন নিষ্ক্রিয় হিসাবের সংখ্যা কমে আসছে। ভবিষ্যতে নিষ্ক্রিয় হিসাবের সংখ্যা আরো কমে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ১৫টি প্রতিষ্ঠান মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িত আছে। এছাড়া ডিজিটাল আর্থিক সেবা (ডিএফএস) দিচ্ছে ডাক বিভাগের প্রতিষ্ঠান নগদ। গত বছরের ২৬ মার্চ নগদ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হিসাবে এখনো পর্যন্ত যুক্ত হয়নি। নগদ বাদে অন্যান্য এমএফএস চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৪৭ লাখ ৮৭ হাজার। যা তার আগের মাস সেপ্টেম্বরের চেয়ে ১৮ লাখ ৫০ হাজার বেশি।

গত সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৩৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। যা আগের মাস আগস্টের চেয়ে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। একক মাস হিসেবে সেপ্টেম্বরে লেনদেন হয়েছে ৪৯ হাজার ১২১ কোটি টাকা। এর আগে জুলাই মাসে রেকর্ড ৬৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় ডিজিটাল এ মাধ্যমে।

মোবাইল ব্যাংকিয়ের নানামুখী ব্যবহারের আর সহজলভ্য হওয়ায় কারণে জনপ্রিয় হওয়ায় গ্রামীণ জনজীবনকে অনেক সহজ হয়েছে। এ সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই অনেক কাজ করা যাচ্ছে। বাস, ট্রেনের টিকিট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন পরিশোধ করা যাচ্ছে মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট যন্ত্রটির মাধ্যমে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেসব কাজ করা যায় সেগুলো হলো, রেমিট্যান্স পাঠানো, ক্যাশ ইন ক্যাশ আউট, একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্যজনের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো, ইউটিলিটি বিল দেওয়া, মোবাইল ফোনের এয়ার টাইম কেনা, পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট পেমেন্ট, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা, বিমা প্রিমিয়াম, ডিপিএস দেওয়া যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, সুবিধাবঞ্চিতদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরের বছর পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। ১৯৯৯ সালে ইউরোপিয়ান ব্যাংকে সর্বপ্রথম মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। মূলত, স্মার্টফোন উদ্ভাবনের পরে মোবাইল ওয়াপ (ওয়্যারলেস অ্যাপ্লিকেশন প্রটোকল) পদ্ধতির মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং শুরু হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা মোবাইল অপারেটর ভিত্তিক হলেও বাংলাদেশে এ সেবা ব্যাংকভিত্তিক। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সেবা দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করলেও এখন সবচেয়ে এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ।